জীবনের পরোয়া করি না, দেশের মানুষের জন্যই ফিরতে হবে: শেখ হাসিনা

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি।

আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো কোনো সাংবাদিক সম্মেলনে সরাসরি কথা বললেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে আলোচিত এই সম্মেলনে ভার্চুয়ালি অংশ নিলেও মুখ দেখাননি তিনি। নয়াদিল্লির ওই অনুষ্ঠানে কণ্ঠতেই সীমাবদ্ধ ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি।

তিনি বলেছেন, ডিসেম্বরেই ফিরে যেতে চান বাংলাদেশে। সুর্নির্দিষ্ট দিনক্ষণ না জানালেও শিগগির সেটি জানিয়ে দেবেন বলেও নেতাকর্মীদের আশ্বস্থ করেন শেখ হাসিনা।

নয়া দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

পাশাপাশ অডিও কলে যুক্ত হয়ে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান।

সশরীরে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

গত কয়েকদিন ধরেই ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর এই সংবাদ সম্মেলন ঘিরে উত্তাপ ছড়িয়েছে সোশাল মিডিয়ায়; এ ধরনের অনুষ্ঠানে যেন তিনি বক্তব্য দিতে না পারেন সেজন্য ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এও বলেছিল, এই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হলে চব্বিশ পরবর্তী দুই দেশের ‘নড়বড়ে’ সম্পর্কে এর প্রভাব পড়বে।

অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষমেশ সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় উদ্বেগ ও হতাশা ব্যক্ত করে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা’ এবং জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রতি ‘গুরুতর অপমান’ বলে বর্ণনা করেছে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওই সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি কবে দেশে ফিরছেন? জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভুগেছেন। আমি এটা আর নিতে পারছি না। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। তাই ডিসেম্বরেই ফিরতে চাই। বাংলাদেশের রিকনসিলেশন দরকার।”

দীর্ঘ বক্তৃতায় শেখ হাসিনা তার সময়ের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ত্যাগের কথা তুলে ধরেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি জানি দেশে ফিরলে তারা আমাকে কারাগারে ঢোকাবে বা মেরে ফেলবে! কিন্ত তারপরও জনগণের কথা চিন্তা করে আমাকে দেশে ফিরতে হবে।”

শেখ হাসিনা ছাড়াও ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আরও বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান।

সশরীরে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

শেখ হাসিনার সম্পূর্ণ বক্তৃতা

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ, দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক সংবাদদাতা ক্লাবের সদস্যগণ, শ্রদ্ধেয় অতিথিবৃন্দ, বাংলাদেশের বন্ধুগণ, ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, আসসালামু আলাইকুম।

দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক সংবাদদাতা ক্লাবকে আমি ধন্যবাদ জানাই এই সুযোগ দেওয়ার জন্য। আমি সেই সাংবাদিকদেরও ধন্যবাদ জানাই, যাঁরা গুরুত্ব ও সাহসের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করে চলেছেন। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো সত্যের অনুসন্ধান করা, বিশেষত যখন ক্ষমতা তা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তগুলোতে এই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ আমি কথা বলছি শুধু সেই মানুষ হিসেবে নয় যে পাঁচবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সম্মান পেয়েছে, বরং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও। আমি কথা বলছি সেই মানুষ হিসেবে যে তাঁর জীবন কাটিয়েছে বাংলাদেশের মানুষের সাথে। আমাকে আমার দেশ থেকে জোরপূর্বক দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমি কখনো আমার মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি।

বর্তমান সংকট নিয়ে বলার আগে, আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নিহত জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি আমার নিজের পরিবারের যাঁদের হারিয়েছি, তাঁদেরও গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি। আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালেরও জন্মদিন। সে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, তরুণ নেতা, ক্রীড়া সংগঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ছিল। তাঁর জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি বহন করে। আজ আমি তাঁকে গভীর ভালোবাসা, বেদনা ও গর্ব নিয়ে স্মরণ করছি।

গত দুই বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশের দুর্ভোগ প্রত্যক্ষ করেছি। আমি সেই মায়েদের সঙ্গে কথা বলেছি যাঁরা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, সেই শ্রমিকদের সঙ্গে যাঁরা কাজ হারিয়েছেন, সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, সেই নারীদের সঙ্গে যাঁরা অপমান ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন, এবং সেই তরুণদের সঙ্গে যাঁরা নিজের দেশে আর ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আত্মগোপনে বাধ্য করা হয়েছে। ভয় ঢুকে পড়েছে ঘরে ঘরে, কর্মস্থলে, ক্যাম্পাসে। এটি সেই বাংলাদেশ নয় যা আমরা গড়েছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয় যার জন্য ১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সত্য দিয়ে শুরু করি। বিশ্বের সামনে একটি বড় মিথ্যা বারবার বলা হয়েছে যে, এই আন্দোলন কেবল একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল। এটি সত্য নয়। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সংস্কারের ভাষার আড়ালে সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ছাত্রদের দাবিকে একটি সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছিল।

২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট যখন সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, সরকার আপিল করেছিল কারণ আমরা এই বাতিলকে বহাল রাখতে চেয়েছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাঁদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনজন মন্ত্রীও তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান করা যেতে পারে। আমরা সংলাপকে বেছে নিয়েছিলাম। আমরা ধৈর্যকে বেছে নিয়েছিলাম। আমরা শান্তিপূর্ণ পথকে বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের কোনো দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। যখনই আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছিল, অদৃশ্য জায়গা থেকে নতুন নির্দেশনা আসছিল। দাবি বদলে যাচ্ছিল। কোটা সংস্কারের আন্দোলন আমার পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা ছড়ানো হয়েছিল। প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আবেগগতভাবে প্রভাবিত করা হয়েছিল, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও ক্ষমতা পরিবর্তনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, এটি একটি একজন “মাস্টারমাইন্ড”-এর নেতৃত্বে “সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো” আন্দোলন ছিল। তাঁর নিজের কথাতেই সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে। এটি নিছক কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। এটি সংগঠিত, পরিচালিত এবং ব্যালট বাক্সের বাইরে দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি পথ তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।

১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেতু ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কার্যক্রম ভবন, ফার্মগেট মেট্রো রেল স্টেশন, হানিফ ফ্লাইওভার, মহাখালী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অফিস, একটি জাতীয় ডেটাবেস কেন্দ্র, একটি কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্প স্থাপনা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নরসিংদী জেলা কারাগারসহ বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করা হয়।

সারাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। নেতাকর্মীরা আক্রান্ত ও নিহত হন। আমার সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও শীর্ষ ব্যক্তিদের বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণমাধ্যমও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রায় পঞ্চাশটি সংবাদ কেন্দ্র, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। মোঃ শাকিল হোসেন, মেহেদী হাসান, তাহির জামান প্রিয়, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক এবং সোহেল আকঞ্জিসহ সাংবাদিকরা নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সংগঠিত হামলা চালানো হয়। কর্মকর্তারা নিহত হন। ফ্লাইওভার থেকে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রায় ৪৬০টি থানা ও ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কর্মীরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। অস্ত্র লুট করা হয়। কর্মকর্তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্যানুসারে, অন্তত তিন হাজার সদস্য নিহত, আক্রান্ত, নির্যাতিত বা গুরুতর সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

তাই আমি একটি সহজ প্রশ্ন করি। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা চালানো হয়, জনগণের সম্পদ ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তারা নিহত হন এবং অস্ত্র লুট হয়, তখন কি রাষ্ট্রের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই? প্রতিটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব থাকে নাগরিক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করা। এটি অপরাধ নয়। এটি আইন কর্তৃক তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব।

একই সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম সত্য প্রকাশিত হোক। সেজন্যই ১৮ জুলাই আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল, প্রতিটি প্রাণহানির তদন্ত হতে হবে, সহিংসতার প্রতিটি ঘটনা পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রতিটি পরিবারের সত্য জানার অধিকার আছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছি। ১ আগস্ট আমি তদন্তকে আরও ব্যাপক, বিশ্বাসযোগ্য ও সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে একে তিন সদস্যের কমিশনে উন্নীত করেছিলাম।

কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই তদন্ত বন্ধ করে দেয়। তারা সত্য প্রকাশিত হতে দেয়নি। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের তারা দায়মুক্তি দিয়েছে। তারা যদি সত্যিই ন্যায়বিচার চাইত, তবে কেন তারা তদন্ত বন্ধ করল? তাদের যদি লুকানোর কিছু না থাকত, তবে কেন তারা হত্যাকারীদের রক্ষা করল? এই একটি সিদ্ধান্তই সত্যটি বলে দেয়। তারা ন্যায়বিচার চায়নি। তারা ক্ষমতা চেয়েছিল। তারা তদন্ত চায়নি। তারা প্রমাণ চাপা দিতে চেয়েছিল।

তাদের নিজেদের কথাতেই সত্য প্রকাশ পেয়েছে। এনসিপির এক নেতা বলেছিলেন, পুলিশ না মারা গেলে এবং মেট্রো রেলে আগুন না দেওয়া হলে “বিপ্লব” সফল হতো না। সিরাজগঞ্জের একজন বিএনপি নেতাও প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, আন্দোলন সফল করার জন্য এনায়েতপুর থানায় আগুন দেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশ হত্যা করা হয়েছিল। এই বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিছক কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল না। এটি লুকানো নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা ও প্রচারণার মাধ্যমে চালিত সাংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপর একটি সমন্বিত আক্রমণে পরিণত হয়েছিল।

৫ আগস্টের পরও ষড়যন্ত্র থামেনি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রাজনৈতিক নিপীড়নের এক অভিযানে রূপ নেয়। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মধ্য দিয়ে ১৬ জুলাই শুরু হওয়া হত্যাকাণ্ড এখনো থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছে। অন্তত দশ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ছয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ নেতাকর্মী ও সমর্থককে নামসহ আসামি করা হয়েছে। দশ লক্ষেরও বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা হেফাজতে নির্যাতন, অপমান ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা অস্বীকার, খাদ্য বঞ্চনা, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার প্রত্যাখ্যানের নথিভুক্ত বিবরণের মধ্যে অনেক নেতাকর্মীও কারাগারে মারা গেছেন।

এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরা আক্রান্ত, গ্রেপ্তার বা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কেউই নিরাপদ নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ও স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনে হামলা চালিয়ে ধাপে ধাপে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এটি অপরিকল্পিত সহিংসতা নয়। এটি বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই দেশের অতীত ইতিহাস মুছে ফেলতে “রিসেট বাটন” চাপার কথা বলেছিলেন। তারা মুক্তিযুদ্ধ মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। তারা যে ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, তার বিপরীতে গিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে লিখতে চায়। দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একটি সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনো ভয়, সন্ত্রাস, নিপীড়ন, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আবদ্ধ।

এখন দেশের অবস্থার দিকে তাকান। আমরা যা গড়েছিলাম, তা ধ্বংস হচ্ছে, আর এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২.২২ শতাংশে, যেখানে আওয়ামী লীগ আমলে তা ছিল ৬.৮০ শতাংশ। শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে কমেছে। গত ৫৪ বছরে প্রথমবারের মতো শিল্প খাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে। দারিদ্র্যের হার ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান তৈরি থমকে গেছে। দুই কোটিরও বেশি মানুষ নতুন করে বেকারত্বের মধ্যে পড়েছেন। পাঁচশোরও বেশি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধেকেরও বেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিদিন ব্যাংক থেকে সাতশো থেকে নয়শো কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সরকার চলছে। প্রকল্পের ব্যয় ৫০ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদ বাড়ছে, নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনে আর নিরাপদ বোধ করছেন না। চাঁদাবাজি, খুন ও অপহরণ প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এগুলো শুধু সংখ্যা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমন এক মা যিনি তাঁর সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারছেন না, এবং এমন এক তরুণ যিনি আর কোনো আশা দেখছেন না।

কিন্তু আমি এটাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল। মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির লক্ষ্য ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই আদর্শের জন্য নিজের জীবন দিয়েছিলেন, আর আমি সেই আদর্শকে পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করেছি। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অহেতুক প্রদর্শনী ছিল না। এগুলো জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ ছিল। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো দান-খয়রাত ছিল না। এগুলো ছিল মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলাম। আমরা একে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিলাম।

আমার পাঁচ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে আমরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সুষ্ঠু আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করেছিলাম। ২০০৮ সালের পর টানা ষোলো বছর ও চার মেয়াদে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। আমরা অর্থনীতিকে সত্তর বিলিয়ন ডলার থেকে সাড়ে চারশো বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছিলাম। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে পৌঁছেছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। দারিদ্র্য ৪১ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছিল। চরম দারিদ্র্য ২৫.১ শতাংশ থেকে কমে ৫.৬ শতাংশে নেমেছিল। আমরা প্রতিটি নাগরিকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩,৭৮২ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৮,৫৬৩ মেগাওয়াটে নিয়ে গিয়েছিলাম।

আমরা প্রায় চৌদ্দ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, যাতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ত্রিশ ধরনের ওষুধ পেতে পারেন। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লক্ষ জীবিত জন্মে ৩৭০ থেকে কমে ১৮৪-তে নেমেছিল। শিশুমৃত্যুর হার ৮৪ থেকে কমে ২১-এ নেমেছিল। নিরাপদ পানীয় জলের সহজলভ্যতা বেড়ে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার পৌঁছেছিল ৯৭ শতাংশে। গড় আয়ু ৫৯ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছরে পৌঁছেছিল। আমরা ৮.৪৫ লক্ষ ভূমিহীন পরিবারকে দুই কাঠা জমি, একটি আধা-পাকা ঘর ও জীবিকা সহায়তা দিয়েছিলাম। অন্তত ৪৫ লক্ষ মানুষ বসবাসের জায়গা পেয়েছিলেন। ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় দশ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সহায়তা পেয়েছিলেন।

আর যখন দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছিল। ঘনবসতিপূর্ণ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও, আমরা তাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দিয়েছিলাম। আমরা তা করেছিলাম কারণ মানবতা তা দাবি করেছিল।

তাই আজ আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি যাঁরা আমার প্রস্থানে উল্লাস করেছিলেন, তাঁরা আসলে কী পেয়েছেন? তাঁরা কি গণতন্ত্র পেয়েছেন? তাঁরা কি নিরাপত্তা পেয়েছেন? তাঁরা কি বাকস্বাধীনতা পেয়েছেন? দ্রব্যমূল্য কি কমেছে? সাধারণ পরিবারগুলো কি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে? মানুষ কি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পাচ্ছে? অর্থনীতি কি শক্তিশালী হয়েছে? গত দুই বছরে সামান্যতম উন্নয়নও কি আপনারা দেখেছেন? নারীরা কি নিরাপদ? শিশুরা কি নিরাপদ? সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা কি নিরাপদ? বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে ভয়, প্রতিহিংসা, দুর্দশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।

আমি বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলতে চাই। কাউকে তোমাদের শক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করতে দিও না। প্রশ্ন করো। দাবি তোলো। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করো। এটা তোমাদের অধিকার। কিন্তু নিজের চোখে সত্যটা দেখো। বোঝো কে তোমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে চায় আর কে তোমাদের ক্ষোভকে ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়ি বানাতে চায়। চরমপন্থা বা প্রতিহিংসার রাজনীতির হাতিয়ার হয়ো না।

বাংলাদেশ গড়তে হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানবিকতা দিয়ে। ধ্বংসের মধ্য দিয়ে কোনো রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। এটি গড়ে ওঠে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়ে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশের বাস্তবতার দিকে তাকাও। বাংলাদেশ, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার রক্ষা করতে হলে এগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই সংগ্রামে অংশ নিতে হবে। তোমরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ।

আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনের প্রয়োজন আছে। দেশের নিরাময় প্রয়োজন। কিন্তু পুনর্মিলনের অর্থ দায়মুক্তি হতে পারে না। যারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, অপরাধ করেছে এবং দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে, তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সুরক্ষা ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পেতে হবে।

বাংলাদেশের এই সংকট শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদাকেও প্রভাবিত করে। তাই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের সকল বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তির জন্য বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতে। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, উন্নয়ন সহযোগী এবং যেসব দেশ গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে তাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশক হতে পারে পুনরুদ্ধার ও নবায়নের দশক, তবে তা তখনই সম্ভব যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণকে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে।

তাই আমি স্পষ্টভাবে এই দাবিগুলো তুলে ধরছি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের সেবা করতে হবে, প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ক্ষমতা ব্যবহারকারীদের নয়। এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়। এগুলো বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

আমার ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেন, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে যাব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছেন, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি আমাকে হয়তো আটক করা হতে পারে। আমাকে হয়তো কারাগারে পাঠানো হতে পারে। মিথ্যা মামলায় দেওয়া রায় তারা হয়তো কার্যকর করার চেষ্টা করবে। কিন্তু ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। আমার জীবন বহু আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পরিবারকে হারিয়েছিলাম। ছয় বছর নির্বাসনে কাটিয়েছি। দেশে ফিরে সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, হত্যাচেষ্টা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। এমনকি ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।

আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি ফিরে যেতে চাই কারণ জনগণ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তির যোগ্য। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের যোগ্য যা তাদের রক্ষা করে, এমন একটি অর্থনীতির যোগ্য যা তাদের সুযোগ দেয়, এবং এমন একটি গণতন্ত্রের যোগ্য যা তাদের অধিকার দেয়। আমার প্রত্যাবর্তন, এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবর্তন, ক্ষমতার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার বিষয়। এটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পথকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়। আমি একটি উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে চাই, জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করতে। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের বিশ্বাস করি। আমি তাদের ওপর আস্থা রাখি। এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে যাব।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া বিবৃতি

এদিকে নয়াদিল্লিতে ওই সংবাদ সম্মেলনের পর রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “পলাতক অভিযুক্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে আজ (বুধবার) বিকালে নয়া দিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। যেখানে তিনি এবং অনুচররা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।

“দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে এ অনুষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে আগে থেকে ভারত সরকারের কাছে উদ্বেগ জানানোর পরও তা হতে দেওয়ায় গভীর ক্ষোভ জানাচ্ছে ঢাকা।”

বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার বলেছে, “বাংলাদেশের মানুষ যেদিন জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন করছে, সেদিন ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবে শহীদের প্রতি বেদনাদায়ক অবমাননা।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, “চব্বিশের জুলাই-অগাস্ট ফ্যাসিস্ট শাসনগোষ্ঠী দ্বারা ক্ষুদে শিশুসহ নিরাপরাধ সাধারণ মানুষের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে অস্বীকার করার মানে হচ্ছে, ইতিহাসের স্রোত পাল্টে দিতে পলাতক অভিযুক্ত গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার দাগী সহযোগীদের ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

“বাংলাদেশ এই ধরনের ঘৃণ্য প্রচেষ্টাকে ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভবিষ্যতেও প্রত্যাখ্যান করে যাবে।”

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আর রাজনীতির সুযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, “জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখার মাধ্যমে আমাদের জনগণ সংকল্পদ্ধ হয়েছে, এই জাতি আর কখনও ফ্যাসিজমের কালো দিনে ফিরে যাবে না। এবং বাংলাদেশ কখনও পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র (ক্লায়েন্ট স্টেট) হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনও স্থান পাবে না অভিযুক্ত গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তার মাফিয়া চক্র।”

আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads