তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতে প্রতিক্রিয়ায় ‘দাদাগিরি’ দেখছে চীন

চীন সফরে সোমবার লিয়াওনিং পৌঁছলে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানো হয় তারেক রহমানকে। ছবি: ভিডিও থেকে
চীন সফরে সোমবার লিয়াওনিং পৌঁছলে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানো হয় তারেক রহমানকে। ছবি: ভিডিও থেকে

প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোনটি? এর সরল উত্তর – মালয়েশিয়া। কিন্তু আদতে কি মালয়েশিয়া? রোববার মালয়েশিয়া যাওয়ার পরদিনই সব কর্মসূচি শেষ করে চীনে উড়াল দিয়েছেন তিনি। সোমবার চীনে পৌঁছেও গেছেন। চার দিন তিনি থাকবেন বেইজিং সরকারের আতিথ্যে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম সফরটি চীনেই হতে পারত? বেইজিংয়ের আমন্ত্রণ ছিল। আমন্ত্রণ ছিল ভারতের। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার। তাহলে কি ভারতকে না চটাতে ‘বাফার’ দেশ হিসেবে এখানে মালয়েশিয়া এসেছে? অনেকের কৌতূহলী মনে এই প্রশ্ন জেগেছে।

অর্থাৎ তারেক রহমান আসলে চীনেই যেতেন। কিন্তু ভারতকে না চটাতে দেখাতে চেয়েছেন যে তার প্রথম সফরটি মালয়েশিয়ায়। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপির এখন দিল্লির কাছে ঘেঁষার তৎপরতা দেখছেন অনেকেই। আবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দিল্লিও বিএনপিকে কাছে টানতে চাইছে।

তার মধ্যে তারেক রহমানের চীন সফর যে ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ট্যাবলয়েড মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস বিষয়টিতে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এনিয়ে একটি নিবন্ধের পর সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করেছে তারা। যেখানে বলা হচ্ছে, তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতের সংবাদপত্রগুলো অযাচিত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

গত ২১ জুন প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, তারেক রহমানের চীন সফরের খবরটি ভারতের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ তিনি ভারতকে এড়িয়ে গেছেন, যা সাধারণত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের প্রথম বিদেশ সফরের ঐতিহ্যবাহী গন্তব্য ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিভিন্ন খাতে চীনা অর্থায়ন এবং প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা মূলত গুরুত্ব পাবে বলে ঢাকার তরফে জানানো হয়েছে।

গত মে মাসে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে আরও গভীর করতে উন্মুখ।

এর মধ্যে খবর বেরিয়েছে, চীন থেকে ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এই তথ্যটুকু ভারতের উদ্বেগের জন্য যথেষ্ট। এর আগে আওয়ামী লীগ আমলে চীন থেকে সাবমেরিন কেনাটাও সুনজরে দেখেনি দিল্লি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। হিন্দুস্তান টাইমস রোববার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া এবং চীনকে বেছে নিয়েছেন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য। এটি ভারতকে এড়িয়ে তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে লিখেছে, তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে প্রতিবেশী ভারতকে বাদ দিয়ে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন। ভারতের আমন্ত্রণ পেয়েও তা এড়িয়ে যাওয়ার কথাটি লিখেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

মালয়েশিয়া সফরে সোমবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমান। ছবি: তারেক রহমানের ফেইসবুক পেজ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক যে নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছিল, তা চীনের জন্য বড় সুযোগ হয়ে আসে; যদিও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তখনও ভালো ছিল। ক্ষমতা হারানোর এক মাস আগে চীন সফরে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে তিনি আন্দোলনের মুখে পড়েন, যা পরে অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে তার পতন ত্বরান্বিত করে।

তারেক রহমানের এই সফর নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া সুনজরে দেখছে না চীন। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক কিয়ান ফেং গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ছিল এবং দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে এবং এটি এখনো একটি সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সম্পর্ক এখনো সম্পূর্ণ স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসেনি।”

তার মতে, ভারত এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা ঢাকার ওপর দিল্লির প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।

তবে কিয়ান বলেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটিকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত হবে না।

গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তেও ছিল একই সুর- “বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়।”

তারেক রহমানের বিদেশ সফর নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরগুলোকে অসন্তুষ্টির প্রকাশ হিসেবে দেখছে চীনের সংবাদপত্রটি।

তাদের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক দাবি করেছেন যে, তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফরে চীন যাচ্ছেন এবং প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অন্যেরা সতর্ক করে বলেছেন যে, পানি ব্যবস্থাপনায় চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল।

“এই ধরনের কটূমন্তব্যের পেছনে কিছু ভারতীয়দের দাদাসুলভ মানসিকতা কাজ করছে, যারা প্রতিবেশী দেশের নেতার প্রথম বিদেশ সফরকে একজন আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অঙ্গভঙ্গি হিসেবে দেখতে চান এবং অন্যান্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিজেদের প্রতি অবমাননা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads