মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা এবার ঘোষণা দিলেন, ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন তিনি। একা নন, ফিরবেন দলের অন্য নেতারাও। সবাই এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তাও জানালেন।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং টানা দেড় দশকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখনও সেখানেই রয়েছেন তিনি।
নয়া দিল্লিতে থেকে সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। তার এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা, মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে কৌতূহল।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে মানবতাবরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির রায় হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে যে আদালত তিনি গঠন করেছিলেন, সেই আদালতেই জুলাইয়ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে রায় হয়। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় গিয়ে এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করেছিল।
সেই অবস্থায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে আইনি বিষয় যেমন জড়িয়ে রয়েছে, তেমনি রয়েছে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। পাশাপাশি ভারতের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেটাই হোক, দলের সভানেত্রীর ফেরার ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হয়েছে।
কী বলেছেন শেখ হাসিনা
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেয় রয়টার্স। কয়েকদিন আগে ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেছিলেন তিনি। রয়টার্সকে সময়ও বলে দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে, এবং তাদের অনেকে পালিয়ে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন, তা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি।
“দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবুও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। যদি মৃত্যু আসে, আমি চাই তা আমার নিজের দেশের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন, যেমাটিতে তাদের রক্ত মিশে আছে,” বলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।
দেশে ফেরার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কিংবা কোনো দেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা না হওয়ার কথাও জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয় … আমি নিজেই ফিরে যাব।”
দেশে যে বিচার চলছে, তার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এরই মধ্যে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। দেশে ফিরে সেই দাবি তিনি প্রমাণ করতে চান।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “যখন কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
“তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ বা ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের সময় যারা একসঙ্গে ছিলেন, তাদের মধ্যে এখন দেখা দিয়েছে বিভেদ। প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, “হাসিনার অপরাধের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।”
তিনি একইসঙ্গে বলেন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে ফিরবেন কি, ফিরবেন না, বা তারা কী করবেন– সেটা তাদের বিষয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে কথা বলছেন, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন বর্তমানে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বক্তব্যের পেছনে একটা অন্তর্নিহিত রহস্য এবং ষড়যন্ত্র যেমন থাকতে পারে, সেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও কেউ কেউ এ ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।”
তিনি বিএনপি সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কোনো অংশ পরিকল্পিতভাবে কাজ করে থাকতে পারে।”
জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে, কেবলমাত্র ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। ফলে সেটার জন্য আমরাও চাই যে ফাঁসির রায় কার্যকর হোক, শেখ হাসিনাসহ অন্য যাদের বিরুদ্ধেই এই রায় হয়েছে।”
শেখ হাসিনাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারেরও সমালোচনা করেন বর্তমান সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ।
রয়টার্স লিখেছে, শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভক্তি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন বর্তমান বিএনপি সরকার দুই বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
ফেরার প্রক্রিয়া কী
শেখ হাসিনা ভারতে গিয়েছিলেন কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে। সেটা অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় গিয়িই বাতিল করেছিল। এখন তিনি পাসপোর্টবিহীন বলে ধরে নেওয়া যায়।
ফলে শেখ হাসিনাকে ফিরতে ট্রাভেল পাস নিতে হবে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এই ট্রাভেল পাস সরকারের কাছ থেকে নিতে হবে।
বিএনপি নেতা, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতে গিয়ে কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও আওয়ামী লীগ আমলে দেশে ফিরতে ট্রাভেল পাস পাননি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ট্রাভেল পাস পেয়ে দেশে ফেরেন।
মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ওনার (শেখ হাসিনা) তো এখন ভ্যালিড পাসপোর্ট নাই এখন। সেক্ষেত্রে তিনি ট্রাভেল পাস চাইলে সেটি দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের। আমাদের দেশে আগেও দেখেছি, সরকার যদি বিরুদ্ধে থাকে, তাহলে সেটি দেয় না। সরকার ট্রাভেল পাস দিলে দেশে আসতে পারবেন তিনি। তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাধা হলো এটি।”
আইনি দিক নিয়ে নানা মত
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, শেখ হাসিনার ফেরত আসায় আইনি কোনো বাধা নেই।
“উনি (শেখ হাসিনা) ফিরবেন, ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। আমাদের নরমাল সিআরপিসির যে প্রসিডিউর, সেটিই উনি ফলো করবেন।”
যেহেতু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাই ট্রাভেল পাস পেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই আটক হবেন বলে মনে করেন মনজিল মোরসেদ।
তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট রুলস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল না করলে কেন দেরিতে করেছে সেই বিষয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করার মতো ব্যাখ্যা দিতে হবে। আদালত আপিল গ্রহণ করলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ স্থগিত হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
দেশে ফিরে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ শেখ হাসিনার থাকছে বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
তিনি বলেন, রায়ের এক মাসের মধ্যে আপিলের বিধান থাকলেও সবসময় তা অনুসরণ করা হয় না, ১০-১৫ বছর পরেও আপিল করার নজির রয়েছে।
শাহদীন মালিক বলেন, “বিশেষত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে আইনের ব্যাখ্যা বদলে যায়।”
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় হলেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ছয় শতাধিক। এর মধ্যে সাড়ে চারশ মামলা হত্যার অভিযোগে।
তবে শাহদীন মালিক যে কথা বললেন, তার দিকে ইঙ্গিত করছেন আরো আইনজীবীরাও।
এক্ষেত্রে বড় নজির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চারটি মামলায় দণ্ডিত ছিলেন তিনি, এ ছাড়া মামলা ছিল কয়েকশ। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সব মামলা উবে যায়।
আর যদি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের কথা বলা হয়, সেখানেও বড় উদাহরণ হয়ে আছেন জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন তিনি। কিন্তু জুলাইয়ের পালাবদলের পর তিনি খালাস তো পেয়েছেনই, সংসদ সদস্যও হয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, ফলে শেখ হাসিনার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। আর রাজনীতির চালচিত্র বদলে যাবে, সেই আশাই করছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা।
আরও খবর:



