অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দুর্নীতি বৃদ্ধি: আসিফ নজরুল দিলেন মূল্যস্ফীতির প্যাঁচ

অবশ্য ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে আমাদের ব্যর্থতা খোঁজা তাই অজ্ঞতার পরিচায়ক।
অবশ্য ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে আমাদের ব্যর্থতা খোঁজা তাই অজ্ঞতার পরিচায়ক।

২০০১ সালের পরের কথা, ক্ষমতায় তখন চারদলীয় জোট, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী, তার ছেলে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন সরকারি পদে না থেকেও ব্যাপক ক্ষমতাবান। তখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সমালোচনা উঠলে তারেক রহমান দেখাতেন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা।

আসিফ নজরুল যেন সেই পথই নিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপে যখন উঠে এল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সেবা খাতে দুর্নীতি ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি বেড়েছিল, তখন সেই সরকারের এই উপদেষ্টা বললেন, মূল্যস্ফীতির তুলনায় এটা তেমন বেশি কিছু নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনকালে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের বাণীতে বলেছিলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা সীমাহীন দুর্নীতি। স্বৈরাচারী সরকার এই দুর্নীতিকে বিশ্বের শীর্ষ স্থানে নিয়ে গেছে। দুর্নীতির ফলে শুধু যে সবকিছুতে অবিশ্বাস্য রকম ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই না, এর ফলে সরকার ও জনগণের সকল আয়োজন বিকৃত হয়ে যায়।”

অথচ টিআইবির খানা জরিপ দেখাচ্ছে, ইউনূস সরকারের আমলেই সেবা খাতে বেড়ে গিয়েছিল দুর্নীতি। সেবা খাতে দুর্নীতির মাত্রা জানতে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৫টি খানার ওপর জরিপ চালায় টিআইবি।

জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, গ্রাম ও শহরাঞ্চল মিলিয়ে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭০.৯ শতাংশ।

একইভাবে ২০২৫ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

টিআইবি জানায়, দুই বছরের ব্যবধানে দুর্নীতি আর ঘুষ দুই ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

তাদের আগের জরিপগুলোতেও দুর্নীতির হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে দেখা গেছে। যেমন- ২০১৭ সালে সব মিলিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছিল সাড়ে ৬৬ শতাংশ মানুষ। পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের জরিপে এই সংখ্যা বেড়ে ৭০ দশমিক আট শতাংশে দাঁড়ায় বলেও জানানো হয়।

অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতিও বেড়েছে। সেটা সরকার যেই থাকুক না কেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

জরিপে অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ভূমি খাত। জরিপে ঘুষের শিকার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, ঘুষ না দিলে তারা সেবা পান না।

গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যাদের ওপর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তারা নিজেরাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এটা তো একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে।

৮০ শতাংশের বেশি মানুষ দুর্নীতির শিকার হওয়ার তথ্য খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালাগ-সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে কেবল উদ্বেগের কথা জানানোর আর কোনো অবকাশ নেই।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জমান বলেন, জরিপে আনা মন্তব্যগুলোতে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা সরকারি কর্মকর্তাদের কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার আমলেও দুর্নীতির বাড়-বাড়ন্ত প্রকাশ পাওয়ার পর এই সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করছেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে ব্যর্থতা খোঁজা অজ্ঞতার পরিচায়ক।

তার মতে, টিআইবি যে তথ্য দিয়েছে, তা তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতির। সেখানে দুর্নীতির যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, প্রতিবছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা বেশি নয়।

আসিফ নজরুল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বরং বড় বড় ক্ষেত্রে, যেমন ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে, নতুন করে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি। এর প্রতিফলন আমরা রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসার মধ্যে দেখতে পাই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে আমাদের ব্যর্থতা খোঁজা তাই অজ্ঞতার পরিচায়ক।”

সব খাতে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে না পারার কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে তার দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি এত বিস্তৃত ও গভীরভাবে সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে যে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি নির্মূলে যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তার সুফল এত দ্রুত পাওয়া সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads