সব বাধা পেরিয়ে এ বছরই দেশে ফিরব: শেখ হাসিনা

সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। ছবি: এএফপি ভায়া এনডিটিভি
সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। ছবি: এএফপি ভায়া এনডিটিভি

দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চলেছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। যে দেশটি তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ থেকেই তাকে সরে যেতে হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের খর্গ এবং বাংলাদেশে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমই নিষিদ্ধ। পরিস্থিতি এর চেয়ে কঠিন হওয়া হয়তো সম্ভব নয়।

তবে এসব কিছুতেই বিচলিত নন শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সেনাপতি জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের বিখ্যাত উক্তির মতোই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমি এ বছরই দেশে ফিরব।’

তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি একটি শক্তি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাতেই আঘাত।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই দলের বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নির্বাসিত অবস্থান থেকে এনডিটিভিকে দেওয়া একান্ত ই-মেইল সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নানা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। রোববার ‘এক্সক্লুসিভ’ সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।

তার কাছে এনডিটিভির সাংবাদিক জানতে চেয়েছিল কবে তিনি দেশে ফিরছেন এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা সত্ত্বেও এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

জবাবে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি এ বছরই নিজের দেশে ফিরে যাবেন।

তার ভাষায়, “আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, আইনের শাসন পুনরুদ্ধার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।

“আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে।

“আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচারের প্রতিফলন নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়। অতীতেও এমন চেষ্টা হয়েছে। তখন যেমন ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।”

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আরও বলেন, “আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট আমাকে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।

“জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের নজিরবিহীন উন্নয়নে কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবন বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দেশের উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”

“তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সব বাধা ও সব ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব,” যোগ করেন তিনি।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারেরর পর আওয়ামী লীগকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতায় দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপি। তবে ইউনূসের রেখে যাওয়া অব্যবস্থাপনা এবং অপরিপক্ক নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে অব্যবস্থাপনার চিত্র সামনে আসছে।

এমন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনার কাছে এনডিটিভির প্রশ্ন ছিল- বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ আবারও জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে—এমন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি দলের রয়েছে?

জবাবে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আওয়ামী লীগ কাগজে-কলমে গড়ে ওঠা কোনো সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

“আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তিকে ভিত্তি করেই আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি।

“বাংলাদেশবিরোধী শক্তিগুলো জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।”

শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বলেন, “মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনেও মানুষ বাস্তবতা নিজেদের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।

“মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বুঝতে পারে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।”

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি অলিগলি আওয়ামী লীগের নখদর্পণে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে।

“আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকদের নিপীড়ন ও নির্যাতন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে।

“আমাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা খুবই স্পষ্ট—ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকুন। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না।

“আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ অতীতেও মানুষের সঙ্গে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।”

এনডিটিভির আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়া বা অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। এটি জনগণের ওপর নির্ভর করে।”

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনার ভাষায়: “অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো সাজানো নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেছে। দলীয় কার্যালয় বন্ধ করেছে। সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম দমন করেছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই আবারও জেগে উঠতে শুরু করেছে।

“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু নেতা-কর্মীরাই নন, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাঁদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস ও সমর্থন দিচ্ছেন। এগুলোই আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের লক্ষণ।

মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যে নিপীড়ন শুরু হয়েছিল তার দেখা মিলছে এখনও। ছবিটি গোপালগঞ্জে গতবছরের ১৬ ‍জুলাইয়ের। আওয়ামী লীগের একজন আহত কর্মীকে এভাবে টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় সেনা সদস্যদের।

“বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। এটি তাদের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।

বলপ্রয়োগ করে আওয়ামী লীগকে দমন করা যাবে না বলেও হুশিয়ারি দেন বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, “যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে থামানো যায় না। ইতিহাস আমাদের শেখায়, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

“বাংলাদেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু যারা আজ ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি গণতন্ত্রের এই ন্যূনতম পথও বন্ধ করে রাখে, তাহলে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।”

এনডিটিভির পরের প্রশ্ন ছিল: আপনি বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ হারিয়ে পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন?

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি সবসময়ই ছিল—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ তবে সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে।

“বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্রবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়েছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানা।

“৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি মাজার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।

“সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে উগ্রবাদের বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

বিএনপির সঙ্গে গোপন সমঝোতা বা ‘ব্যাকচ্যানেল’ আলোচনার খবর নিয়েও প্রশ্ন রাখেন এনডিটিভি সাংবাদিক।

তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান- বিষয়টি কতটা সত্য?

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের খবর ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার অংশ এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্টে শিক্ষার্থীদের উদযাপন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন সমঝোতার বিষয় হতে পারে না; এগুলো সাংবিধানিক অধিকার।

তার মতে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। একইভাবে ন্যায়বিচারও কারও দয়া নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাহলে তা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। রাজনৈতিক প্রভাব, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।

শেখ হাসিনা জোর দিয়ে বলেন, তিনি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিলেন, তবে সেই সমাধান হতে হবে প্রকাশ্য, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। আওয়ামী লীগ কারও কাছ থেকে রাজনৈতিক দয়া চায় না; দলটি জনগণের সমর্থন ও সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর হুমকি সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাওয়া হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগজনক।

তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে বা সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি এসেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং সুফি ধারার অনুসারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। তিনি মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘরে লুটপাট, চাঁদাবাজি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন।

তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বা যারা কারাবন্দি আছেন, সেটিও তাঁর মতে উদ্বেগজনক বিষয়।

শেখ হাসিনা বলেন, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়; তারা বাংলাদেশের সমঅধিকারসম্পন্ন নাগরিক। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

তার মতে, যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায় বা উপাসনালয় ভাঙচুর করে, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনারও বিরোধী।

তিনি রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, হামলার ঘটনাগুলোর বিচার করতে হবে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

ভারতে নির্বাসিত জীবন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেন, তার ব্যক্তিগত জীবন বহু বছর ধরেই প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, তিনি নিজের জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন।

তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর পরও তাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকতে হয়েছিল। পরে দেশে ফিরে তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই কঠিন সময়ে দেশের মানুষের পাশে সরাসরি থাকতে না পারাটা তার জন্য কষ্টের।

তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশেই- যেখানে তার পিতার সমাধি, যেখানে তাঁর পরিবারের রক্ত মিশে আছে এবং যে দেশের মানুষের জন্য তিনি সারা জীবন কাজ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, দেশ থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কষ্টের খবর শোনা তার জন্য গভীর বেদনার।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নির্বাসনে থেকেও প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতির খোঁজ রাখেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, নির্যাতিত পরিবারের কথা শোনেন এবং আন্তর্জাতিক মহলের সামনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তার শক্তির উৎস বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

“আমি বিশ্বাস করি, জনগণ একদিন আবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসবে।

“জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যেতে চাই,” বলেছেন দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের শাসনভার সামলানো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads