বাংলাদেশে হঠাৎ কলেমা লেখা পতাকা ওড়ার নেপথ্যে কী?

কলেমা লেখা পতাকা ওড়াচ্ছেন বিভিন্ন জন, যেসব ছবি ঘুরছে ফেইসবুকে।
কলেমা লেখা পতাকা ওড়াচ্ছেন বিভিন্ন জন, যেসব ছবি ঘুরছে ফেইসবুকে।

ফুটবল বিশ্বকাপ যখন চলে, তখন বরাবরই বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়তে দেখা যায় বাংলাদেশে। কিন্তু এবার বিশ্বকাপ ছাপিয়ে আলোচনায় চলে এসেছে ভিন্ন এক পতাকা। তা হচ্ছে, কলেমা লেখা পতাকা।

সাদা জমিতে কালো কালিতে মুসলমানদের পবিত্র কলেমা লেখা পতাকা গত ১৬ জুন হঠাৎ দেখা গেল রাজধানী শহর ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভারে। সীমান্ত জেলা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে সড়কে দুই পাশ ছেয়ে গেছে এমন পাতায়। এর বাইরেও বিভিন্ন স্থানে ওড়ানো হয় এমন পতাকা।

এমন পতাকা যারা ওড়াচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ যুক্তি দেখাচ্ছেন, ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী নানা দেশের পতাকা ওড়ানো গেলে এই পতাকায় কী ক্ষতি। তবে এ নিয়ে আশঙ্কিত হচ্ছেন অনেকে। তাদের ভাষায়, এমন পতাকা বাংলাদেশকে ইসলামী জঙ্গি রাষ্ট্রের তকমা দিতে পারে। আর তাতে দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ভাবমূর্তি সমস্যায় পড়ে বিদেশে বাংলাদেশিরা পড়তে পারেন বিপদে।

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দা কিংবা আইএস এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর এই ধরনের কলেমা লেখা পতাকা উড়িয়ে থাকে। যে কারণে পশ্চিমা বিশ্বে এই পতাকাকে দেখা হয় ইসলামী জঙ্গিদের প্রতীক হিসেবে। ফলে বাংলাদেশে যারা ওড়াচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারি মহলের মধ্যেও সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।

২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে ৫ আগস্ট যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তখন এই কলেমা লেখা পতাকা উড়তে দেখা গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি সাদা চোখেই ধরা পড়ে।

বিভিন্ন মাজারে হামলা, গানের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, পোশাক নিয়ে আপত্তি তুলে নারীদের ওপর আক্রমণ- এমন নানা ঘটনায় মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করে। এই অভিযোগও ওঠে যে উগ্রবাদ গোষ্ঠীকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়েছিল তখন।

নির্বাচনের পর যখন বিএনপি সরকার গঠন করল, তখন আবার কলেমা লেখা পতাকা হঠাৎ করেই আবার দেখা দিচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় কলেমা লেখা পতাকা সড়ক ও সেতুতে ওড়ানোর পাশাপাশি পতাকা হাতে মোটরসাইকেল মিছিলও দেখা গেছে। মিছিলকারীরা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন ‘তৌহিদী জনতা’ নামে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে কলেমা লেখা পতাকা সরিয়ে ফেলার প্রতিবাদে গত শুক্রবার বগুড়ার শেরপুরে ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে একই রকম পতাকা হাতে মিছিল হয়েছে।

ফেইসবুকের বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক পেইজ ও মার্কেটপ্লেসে অনেকেই কালেমাখচিত পতাকা বিক্রি করছেন। আকার ভেদে ১১০ থেকে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত দামে পতাকা পাওয়া যাচ্ছে।

ফেইসবুকের বিভিন্ন পেইজে পতাকা ওড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতা মুফতি হারুন বিন ইজহারের নাম ব্যবহার হচ্ছে। ফেইসবুক প্রচারিত হারুন ইজহারের একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “এই যে আর্জেন্টিনা, তারপরে এই যে বদমায়েশি শুরু হইছে। আলহামদুলিল্লাহ আমাদের তরুণেরা কালেমার পতাকা লাগানো শুরু করছে। আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগাই দিবেন। যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এগুলো সব পতাকা নামেইতে হবে। এগুলো থাকবে তো আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।”

তবে ইসলামী বিভিন্ন লেখক কলেমা লেখা নিয়ে আপত্তি না করলেও এই পতাকার নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তারা এমনও বলছেন, মুসলমান প্রধান বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে এর আগে তো কখনও কলেমা লেখা পতাকা ওড়ানোর দরকার পড়েনি। এখন যারা করছে, তাদের নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক মতলব রয়েছে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদারীপুর শহরের মডেল মসজিদ মোড়ে গত শনিবার আসরের নামাজ শেষে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে মিছিল হয়। মিছিল শেষে সমাবেশে ফখরুদ্দিন রাজী নামে একজন ঘোষণা করেন, তারা যে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছেন, সেটা ‘মুসলিমদের পতাকা’।

তবে ইসলাম ধর্মে এমন কোনো পতাকার নজির নেই বলে ইসলামী পণ্ডিতদের ভাষ্য। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান সিকদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ইসলামের নামে কোনো পতাকা যদি হতো, তাহলে তো আমরা সবাই সেটা ব্যবহার করতাম। এখানে কোনো উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে কখনই দাবি করা হয় নাই যে, এটা বা ওটা ইসলামের পতাকা। রাসুলের জামানায় তিনি পতাকা ব্যবহার করতেন, তবে সেটা যুদ্ধের সময়। সেই পতাকা আবার একেক যুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ছিল। ইসলামের রেওয়াতে নির্ধারিত কোনো পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।”

হারুন ইজহারের নামে পতাকা ওড়ানো হলেও তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “চট্টগ্রামে লালখান বাজারে আপনি আসেন, এখানে তো আমাদের মাদ্রাসা, আমাদের লোক সব। কিন্তু এখানে কোনো পতাকা দেখবেন না। আমি যদি আয়োজন করে পতাকা টানাতে বলতাম, তাহলে আমার নিজের এলাকাতেও তো থাকতো।”

তাহলে ভিডিওতে বলা বক্তব্যের ব্যাখ্যা কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা ফুটবল খেলাকে ঘিরে বলা হয়েছিলো।

মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের দৃষ্টিতে, সম্প্রতি ওড়ানো পতাকাগুলোর সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যবহার করা পতাকার মিল রয়েছে।

তিনি বলেন, “আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো এবং নাইজেরিয়ার বোকো হারাম – সেখানেও এই পতাকার ব্যবহার দেখবেন। আইসিসের যে কার্যক্রম সেখানেইএই পতাকার প্রদর্শন দেখবেন। আর আমাদের এখানে অতীতে হরকাতুল জিহাদ বা অন্যরা যারা ছিল তাদেরও কিন্তু এই পতাকার ব্যবহার ছিল। এখন এটা ব্যবহার করছে হিযবুত তাহরীর।”

নুর খান লিটনের সন্দেহ, একটি গোষ্ঠী খুব কৌশলে এই পতাকাটাকে ব্যাপকমাত্রায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

মাদারীপুরে পুলিশের সামনেই কলেমা লেখা পতাকা নিয়ে মিছিল, বাইক শোভাযাত্রা হয় সম্প্রতি। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

যখন ভারতে কর্মরত ইসরাইলের একজন কূটনীতিক বাংলাদেশে সশস্ত্র ফিলিস্তিনি সংগঠন ‘হামাস’ এর তৎপরতার অভিযোগ তুলেছেন, তখন এই পতাকা নিয়ে তৎপরতা সন্দেহজনক বলে মনে করছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কেউ বাংলাদেশকে আবার বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত করার চিন্তাভাবনা করছে বা ওরকম পরিচিতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি না, তাতো বলতে পারি না। আমার মনে হয়, এটা খতিয়ে দেখা দরকার।”

‘ঢাকা স্ট্রিম’ কলেমা লেখা পতাকা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে যার শিরোনাম ছিলো ‘সাদা-কালো পতাকার নেপথ্যে কারা?’ এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ।

ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পুলিশ এর তদন্ত করছে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদও এখন পতাকা ্ওড়ানোর বিষয়টি সন্দেহের চোখে দেখছেন। তিনি বলেছেন, কলেমাখচিত পতাকা বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, অবমাননা কিংবা রাজনৈতিক অপব্যবহার কাম্য নয়। এটা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের কারণ হতে পারে।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মনে হচ্ছে ভিনদেশি উগ্রবাদীদের কিছু আচরণ বা সংস্কৃতিকে মূলধারায় আনার চেষ্টা করছে একটা গোষ্ঠী। মনে হচ্ছে তারা খুব সুকৌশলে কলেমার নামে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নৈতিক সমর্থন পেতে চাইছেন।”

তবে এই তৎপরতা প্রতিরোধে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম. শাহাদাত হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কোনো পতাকা বা প্রতীক যদি নিষিদ্ধ বা উগ্রবাদি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বহন করে কিংবা জননিরাপত্তা বা আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads