দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার বার্তা দেওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি ঘোষণা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দলটির এই তৎপরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিজেদের ইতিহাসে বড় দুঃসময় পার করছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়ে আছেন ভারতে। দেশে তার মাথায় ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া।
দলটির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা বিদেশে পালিয়ে আছেন। দেশে যারা আছেন, তাদের বেশিরভাগ রয়েছেন কারাগারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পরও তা রয়েছে বহাল।
এত প্রতিকূলতার মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গত ২৩ জুন দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত মিছিল বের করে। তা করতে গিয়ে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। ঢাকায় মিছিল করতে গিয়ে ধাওয়ার মুখে নদীতে পড়ে কয়েকজন মারাও গেছেন।
তারপর গত ২৮ জুন শেখ হাসিনা ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি এ বছরই দেশে ফিরব।”
প্রতিকূল পরিস্থিতি জয়ের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো সাজানো নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেছে। দলীয় কার্যালয় বন্ধ করেছে। সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম দমন করেছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই আবারও জেগে উঠতে শুরু করেছে।”
এরপর গত ৭ জুলাই আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেইসবুক পাতায় ঢাকা মহানগর উত্তরের চারটি থানা এবং ২৪টি ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
কাদের নিয়ে কমিটি?
ফেইসবুকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের এক জরুরি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুসারে কমিটিগুলো গঠনের কথা জানানো হয়। তবে ওই কমিটির সভা কবে হয়েছে, তা বলা হয়নি।
মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর, আদাবর ও কাফরুল এই চারটি থানার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক এম এম মান্নান কচির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে।
এছাড়া উত্তরের বিভিন্ন থানার অন্তর্ভুক্ত ৪, ৯, ১১, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২৪, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৭, ৪৩, ৫০, ৯৪, ৯৫, ৯৬ ও ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক কমিটি্ও ঘোষণা করা হয়।
কমিটিগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর নেতৃত্বের বেশিরভাগই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। কারও অবস্থান জানা নেই। এদের কেউ কেউ বিদেশে রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক করা হয়েছে অধ্যক্ষ এম এ সাত্তারকে। তিনি আগে এই কমিটির সভাপতি পদে ছিলেন। এই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কদের দুজন বর্তমানে কারাবন্দি।
মোহাম্মদপুর থানা কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে সাবেক কাউন্সিলর, যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীবকে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের আস্থাভাজন রাজীব বর্তমানে বিদেশে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
মোহাম্মদপুর থানার ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সলিমুল্লাহ সলুকে। সাবেক এই কাউন্সিলর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ওই থানার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন আহ্বায়ক নুরুননবী ভোলাও রয়েছেন কারাগারে।
শেরেবাংলা নগর থানা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ফোরকান হোসেনকে। সাবেক এই কাউন্সিলর এখন রয়েছেন কারাগারে। এই কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে ইফতেখারুল আলম হিরককে।
আদাবর থানার নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে আবুল হাসেম হাসুকে। সাবেক এই কাউন্সিলর এখন কারাগারে রয়েছেন। কমিটির সদস্য সচিব ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরিফুর রহমান তুহিন।
কাফরুল থানার আহ্বায়ক করা হয়েছে জামাল মোস্তফাকে। সাবেক এই কাউন্সিলরও বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সেজন্য ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক কাউন্সিলর মতিউর রহমান মোল্লাকে। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে থাকছেন মইজ উদ্দিন।
এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটির নেতাদের বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। কমিটিগুলোতে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাদের প্রাধান্য দেখো যাচ্ছে।
কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের অগাস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। এর পরের বছর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিতে পারেনি।
গত বছরের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, “আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কর্তৃক যে কোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।”
এর ফলে আওয়ামী লীগ কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। মিছিল কিংবা সভা করতে গেলেই পুলিশ ধাওয়া এবং গ্রেপ্তার করে।
তাহলে এখন কেন কমিটি গঠন?
যখন কার্যক্রম চালানোরই সুযোগ নেই, তখন কমিটি গঠনের মানে কী, সেই প্রশ্ন জাগছে অনেকের মনে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনের কার্যক্রম আরও গতিশীল, সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে এই কমিটি গঠন।
সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারলেও বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি সরকার। এই নির্বাচনগুলোতে অধিকাংশ পদে ভোটে নির্দলীয় হবে বলে সেখানে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে।
তার ঠিক আগেই আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠনের দিকে গেল। তাতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে দলটির নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞার পরও ধীরে ধীরে চাঙা হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এই কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া আরো গতিশীল করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আপনারা দেখছেন, মাঠে আওয়ামী লীগ নামছে, ভবিষ্যতে আরও শক্তি নিয়ে নামবে। আর কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছেন, তারা দুঃসময়ে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামছেন। সেই কাজের স্বীকৃতি পেয়ে তারা আরো সক্রিয় হবেন, তাতে দলীয় কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে।”
নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, “দেখুন, এবারের ভোটের হার তো দেখিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কতটা। ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করলেও মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষেই রয়েছে।”
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। তার মধ্যে ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি জোট পায় ৩১ শতাংশ ভোট।
আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির ওই সদস্য বলেন, মোট ভোটের সংখ্যার হিসাব করলে ২২ শতাংশের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তার মানে এই সরকারের পেছনে জনসমর্থন শক্তিশালী নয়। আর বিএনপি এখনও সাংগঠনিকভাবে অতটা শক্তিশালীও নয়। তাই আওয়ামী লীগ সংগঠিত হয়ে রাজপথ দখল করলে বিএনপির তা ঠেকানোর সামর্থ্য নেই। পরিস্থিতি সেদিকে ঘুরে গেলে প্রশাসনও বিএনপির পক্ষে সেভাবে দাঁড়াবে না।
আর আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে থাকলেও এখন জামায়াত-এনসিপির সঙ্গে বিএনপির দূরত্বের দিকটি দেখিয়ে তিনি বলেন, তাই বিএনপি বেকায়দায় পড়লে এই দলগুলো তাদের পাশে দাঁড়াবে না।
এই পর্যবেক্ষণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি পক্ষ- আওয়ামী লীগ ও অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। এই দলগুলো সবাই অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। তাই তারা বরং বিএনপির স্থানটি দখল করে নিতে চাইবে।”
সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগের এই নেতা মনে করেন, ২০২৭ সালের মধ্যেই রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ স্বমহিমায় ফিরবে। আর কমিটি গঠনের মধ্যদিয়ে তার প্রস্তুতি পর্বই শুরু হলো।
আরও খবর:



