বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ-ইনের উত্তেজনা

বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের পুশব্যাক। ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের পুশব্যাক। ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

হঠাৎ করেই উত্তেজনা শুরু হলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েনের সময় এমন উত্তেজনায় কেউ অবাক হতো না। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় বসার পর যখন সম্পর্ক জোড়া লাগার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, তখনই পুশ-ইন শুরু হয়।

ভারতের দিক থেকে এটা পুশ-ব্যাক। তাদের দাবি, অবৈধভাবে যেসব বাংলাদেশি সেদেশে অবস্থান করছিল, তাদের ধরে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বের কয়েকটি সীমান্তে এই পুশ-ইন চেষ্টার ঘটনা ঘটছে কিছুদিন ধরে। ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ ওই মানুষদের জোর করে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী আবার তাদের ভারতের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

বিজিবি গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অন্তত দশটি জায়গায় পুশ-ইনের চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানায়। এগুলো হলো- ঝিনাইদহে যাদবপুর সীমান্ত, মহেশপুর সীমান্ত, যশোরের গোগা ও রোদ্রপুর সীমান্ত, জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেব সীমান্ত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত, ঠাকুরগাঁও সীমান্ত, নেত্রকোনা সীমান্ত, পঞ্চগড় সীমান্ত, সিলেটের উৎমাছড়া সীমান্ত।

বিজিবি সব চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়ার দাবি করলেও সোমবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বললেন, এক মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনকে ‘ওপারে’ অর্থাৎ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত পাঠাতে আরো ৮৬৩ জনের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।

দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন শুরুর দিনই এই কথা জানালেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এই রাজ্যে এক মাস আগেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ক্ষমতায় আসা দল বিজেপি আগে থেকেই অবৈধদের ভারত ছাড়া করার বিষয়ে সোচ্চার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ ভোটের প্রচারের সময় বারবার বলেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় গেলে অবৈধদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়ানো হবে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে বিএসএফ চেকপোস্টের পাশে জড়ো করা মানুষ, যাদের পুশ-ব্যাক করা হবে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “আমাদের সব চেয়ে বড়ো ইস্যু ছিল সীমান্ত সুরক্ষা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। … সিএএ-এর আওতায় যারা পড়েননি, সেই ধরনের অনুপ্রবেশকারীদের ডিপোর্ট করার কাজ নিয়ম মেনে শুরু করেছি। একটি আইন ছিল ভারত সরকারের, সেই আইনে তাদের জেলে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের হাতে হ্যান্ডওভারের আইন ছিল।”

তিনি জানান, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিশেষ ‘হোল্ডিং স্টেশন’ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের অস্থায়ীভাবে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধাপে ধাপে তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বিবিসিকে বলেন, “৪ হাজার ৮০০ জন অনুপ্রবেশকারী ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায় গিয়েছেন।”

বিজেপির দাবি, যারা ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতায় পড়েন না, তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।

এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত যেসব মানুষ ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না। ফলে মুসলিমরাই বিতাড়নের ঝুঁকিতে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, মুসলিমদের চিহ্নিত করে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।

কীর্তনিয়া বলেন, “অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী আলাদা। অনুপ্রবেশকারী হলেন তারা, যারা ১৯৪৭ সালের পর হিন্দুদের সঙ্গে থাকতে না চেয়ে ভারতবর্ষে আসেননি বা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আজ তারা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে তাদের জীবন জীবিকার জন্য আবার ভারতের জল, জমি, খাদ্যে ভাগ বসাচ্ছেন। তাদের পশ্চিমবঙ্গে কোনো স্থান নেই।”

তবে ভারতের এই প্রচেষ্টায় সেদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ জানাচ্ছে।

‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’র সহসভাপতি রঞ্জিত শূর প্রশ্ন তুলছেন, “আমরা জানতে চাই পুশব্যাক হওয়া এই ৪৮০০ জন কারা? পাইপলাইনে থাকা ৮০০ জনই বা কারা? কী তাদের নাম ধাম পরিচয়? শ্বেতপত্র প্রকাশ করে সত্য জানাক সরকার।”

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশি কেউ অবৈধভাবে সেখানে থাকলে ভারত সরকারের উচিত হবে প্রমাণসহ তাদের তালিকা দেওয়া।

নতুন সঙ্কট

গত মাসের শুরু থেকে সীমান্তে বিএসএফের একের পর এক পুশ-ইন চেষ্টা দেখে সীমান্ত বিজিবিকে শক্ত অবস্থান নিতে বলে বাংলাদেশ সরকার।

এরপর বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যে কোনো পুশ-ইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।”

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সোমবার ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, পুশ-ইন বন্ধ করার জন্য ভারতকে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এতে গুরুত্ব না দিলে তা দুই দেশের সম্পর্ক সহজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে দুই দেশ যখন আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং উভয় সরকার যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার আগ্রহ প্রকাশ করছে, তখন হুট করে সীমান্তের এতগুলো জায়গা দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা অনেককেই বিস্মিত করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে ভিন্ন ধরনের বার্তা থাকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে বাংলাদেশের সাথে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে বিএসএফকে ব্যবহার করে লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা স্বাভাবিক বিষয় নয়।

দরকষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরির জন্য বিএসএফকে ব্যবহার করে পুশ-ইন করার এসব চেষ্টা হতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে বিএসএফ এদের জড়ো করেছে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বিবিসিকে বলেন, অন্য কোনো কারণে বাংলাদেশের ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তার কাছে মনে হচ্ছে, কারণ ঘটনাগুলো এমন সময়ে হচ্ছে যখন উভয় সরকারই সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, পুশ-ইনের এই ঘটনাগুলো কিছুটা বিস্ময়কর কারণ এখন উভয় সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলছে।

তার ভাষ্যে, “পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে কি না, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। পুশ ইন হুট করে বেড়ে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ কী সেগুলো বুঝতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। হয়তো তখনই দেখা যাবে যে এটা ছিল আসলে বাংলাদেশকে চাপে রাখার কৌশল।”

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চেন্নাই থেকে বাংলাদেশ ৩৪ জনকে ফেরত এনেছে। ফলে অবৈধ কোনো বাংলাদেশি সেখানে থেকে থাকলে তাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া আছে। পুশ-ইন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

“পুশ-ইনের মাধ্যমে যদি তারা করে, তাহলে সেটা ভালো হবে না। ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় ওঠার চেষ্টা হচ্ছে বা তারাও যে প্যারাডাইম শিফটের কথা বলছে সেটা করতে হলে এই কাজগুলোর জন্য যে বিদ্যমান প্রক্রিয়া আছে সেটাই দুই দেশকে অবলম্বন করা উচিত,” বলেন শামা ওবায়েদ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads