স্থানীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগই কি ফ্যাক্টর হচ্ছে?

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

লক্ষ্মীপুর বিএনপির ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। এই জেলার সদর আসনে বরাবরের মতো এবারও বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তার জয় অনুমেয়ই ছিল, কিন্তু ভোটের ব্যবধানটি বিএনপির প্রত্যাশায় ছিল না।

১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোট পেয়েও মাত্র ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের কেউ ছিল না, কারণ দলটি তো নির্বাচনেই অংশ নিতে পারেনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর রেজাউল করিম, তিনি যে খুব পরিচিত, তাও নন।

এই এ্যানির পরাজয়ের ঘণ্টাও বেজে যেতে পারত। সেটা কীভাবে, তা বললেন সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের এক আওয়ামী লীগ সমর্থক। জামায়াত প্রার্থীর বাড়ি এই ইউনিয়নেই। তিনি বললেন, “আমি তো আর নৌকা ছাড়া কাউকে ভোট দিতে পারি না। তবে পরিস্থিতি দেখে বউ-ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম ভোট দিতে, তারা ধানের শীষে ভোট দিয়ে এসেছে। কারণ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের জয় তো দেখা সম্ভব নয়।”

ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নির্দলীয় এই নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগের ভোটই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা কি অংশ নিতে পারবে?

আইনের কথা যদি ধরা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ করার কারণে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।

সংসদ নির্বাচনে বাধা ছিল, কারণ মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম করে রেখেছিল নিষিদ্ধ। বিএনপি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলেও স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই এখানে কারও জন্য কোনো বাধা নেই।

স্থানীয় নির্বাচন কবে হবে, সরকার এখনও সিদ্ধান্ত না নিলেও নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হলে যে কেউ অংশ নিতে পারবে এই নির্বাচনে।

বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বুধবার বিবিসি বাংলাকে বলেন, কোনো দল বাদ দেওয়ার মতো কোনো বিধান আচরণবিধিতে রাখা হয়নি। প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবেন নির্বাচনে।

প্রথমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দেওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা রাখা হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের পর পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন নির্বাচনেরও বিধিমালা একই রকম হবে বলে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সময় দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের বিধান আনা হলেও ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বিধান বাদ দেয়। ফলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্য তা সুযোগ হয়ে দেখা দিচ্ছে। দলটির ইসির নিবন্ধন স্থগিত থাকার পরও নেতাদের অংশ নিতে বাধা থাকছে না।

মাছউদ বলেন, “আমরা দেখবো না কে কোন দল করে। যদি কেউ ওই পদে নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করে, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।”

গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের হয়েও নির্দলীয় থাকেন, তাও পারবেন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না।”

ভোটের সমীকরণ বদলে যাবে?

একে তো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তার ওপর দেশে থাকা নেতাদের অধিকাংশই আছেন কারাগারে। তারপরও দলীয় নেতা-কর্মীরা স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমাদের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন, তারা যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে থেকে এই নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি আছে। অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলোর সাথেও আমাদের আলাপ আলোচনা চলছে।”

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে এবার ভোটের হিসাব নিকাশও বদলে যেতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেনি। যে কারণে তারা অন্য দলের দিকে ধাবিত হলেও এবার তারা নিজেদের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে বদলে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ।”

তার মতে, যদি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সেক্ষেত্রে কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধ’ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে একটা কামব্যাকের বড় সুযোগ তৈরি হবে।

তবে মাঠের চিত্র দেখাচ্ছে অন্য রূপ। সুযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভোটে দাঁড়াতে আগ্রহী হবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আওয়ামী লীগের এক তৃণমূল নেতা বলেন, “এখন আওয়ামী লীগের যারা কারাগারের বাইরে আছে, তারা চুপচাপ আছে। কারণ সক্রিয় হয়ে উঠতে গেলেই নানা ঝঞ্ঝাটে পড়তে হবে। তাই এখন প্রকাশ্যে নির্বাচনে নেমে হয়রানিতে পড়ার ঝুঁকি নিতে বেশিরভাগই রাজি হবে না।”

বরং স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় অধিকাংশ স্থানে বিএনপির একাধিক প্রার্থী হবে বলে ধারণা করা যায়। এই সুযোগে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে দর কষাকষি করে এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলার সুযোগ আদায় করে নেওয়া সহজ হবে বলে ওই আওয়ামী লীগ নেতা মনে করেন।

তার মতে, বৃহত্তর ফরিদপুরের মতো যেসব এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে কেউ কেউ প্রার্থী হতে পারেন, তবে অন্য জেলাগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রার্থী হওয়ার চেয়ে এলাকায় তৎপর হওয়ার সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।

তিনি মনে করেন, যেহেতু আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক রয়েছে, তাই বিএনপির প্রার্থীরা তাদের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্যে আসতে সুযোগ করে দেবে। ফলে এই সমীকরণেও আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকলেও তাদের ভোটই হতে যাচ্ছে স্থানীয় নির্বাচনের ফ্যাক্টর।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads