দুবাইয়ে কে দিল ধরিয়ে? বেনজীরের সামনে কী?

বেনজীর আহমেদ
বেনজীর আহমেদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আসার পর থেকেই আলোচনায় সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ। বাংলাদেশের অনুরোধে তাকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। তবে তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।

দেশে নানা মামলায় ফেরারী বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপির সরকার। কিন্তু তাতে সফল হওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। তিনি আমিরাতের বাসিন্দা হয়ে গেছেন, আবার বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন না বলে জানা গেছে। ফলে তাকে বাংলাদেশের ফেরত পাওয়াটা কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ আমলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব সামলানোর পর পুলিশ মহাপরিদর্শক পদ পেয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর মধ্যে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আসে। নিষেধাজ্ঞাটি ছিল মূলত র‌্যাবের ওপর, বাহিনীর সাবেক প্রধান হিসেবে তার নামও আসে নিষেধাজ্ঞায়, যদিও তখন তিনি ছিলেন আইজিপির পদে।

২০২২ সালে অবসরে যাওয়ার পর বেনজীরকে নিয়ে খুব একটা আলোচনা ছিল না। দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে তার নাম আবার আলোচিত হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগই তখন ক্ষমতায় ছিল, তাকে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরুর পর ওই বছরের মে মাসে গোপনে সপরিবারে দেশ ছাড়েন তিনি।

তার তিন মাসের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, তার বিরুদ্ধে দুদকের ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটির বিচার চলছে, অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে একটিতে, বাকিগুলো এখনও তদন্তের পর্যায়ে। এর বাইরে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায়ও তদন্ত চলছে।

দুই বছর পর আকস্মিকভাবে গত ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানান, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেনজীর আহমদকে। বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে এখন দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

ধরিয়ে দেন বন্ধু?

প্রথমে খবর ছড়িয়েছিল আমিরাত ছাড়ার সময় দুবাই বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বেনজীরকে। পরে জানা যায়, বিমানবন্দর নয়, একটি শপিং মল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ১২ জুন।

বেনজীরকে তার এক বন্ধু ধরিয়ে দেন বলে বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংবাদপত্র এশিয়া পোস্ট খবর দিয়েছে। ওই বন্ধু তার ব্যবসায়িক অংশীদার এবং তিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য বলেও জানিয়েছে সংবাদপত্রটি।

এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বন্ধুও ব্যবসায়িক সহযোগী চট্টগ্রাম এলাকার এক সংসদ সদস্য মোবাইল ফোনে ওই শপিং মলে ডাকেন বেনজীরকে। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানে গেলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

তার এক সময়ের স্টাফ অফিসারের বরাতে এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১২ জুন দুবাইয়ের বাসায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। এ সময় তার বন্ধু চট্টগ্রামের এক সংসদ সদস্য মোবাইল ফোনে কল করে বাসার পাশের একটি শপিং মলে দেখা করার কথা বলেন। তিনি বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে শপিং মলে গেলে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া দুবাই পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যান।

ইন্টারপোলের রেড নোটিসের খবর দুবাই পুলিশকে ওই বন্ধুই দিয়েছিলেন, গ্রেপ্তারের সময় তার অনুগতরাও পুলিশের সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে।

ওই সংসদ সদস্যের নাম প্রকাশ করেনি এশিয়া পোস্ট। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

আর বেনজীরকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে দুবাই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

দুবাইয়ে ছিলেন যেভাবে?

বেনজীর দেশ ছাড়ার পর পরিবার নিয়ে দুবাইয়ে থাকছেন বলে এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়।

যতদূর জানা যায়, তিনি দেশে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থের মধ্যে বিদেশে নিয়ে এসেছেন। তা আমিরাতে বিনিয়োগ করে দেশটির স্থায়ী বাসিন্দাও হয়েছেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেনজীর সিঙ্গাপুর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান। তার আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ভিসা রয়েছে। আমিরাত থেকে কাতার, সৌদি আরব, স্পেনে যাতায়াত করেছেন তিনি।

বিনিয়োগ করলে আমিরাতে বসবাসের অনুমতি মেলে। বেনজীর সেই সুযোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিনিয়োগকারীদের ১০ বছর মেয়াদী গোল্ড কার্ড দেয় দুবাই। তা তিনি পেয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

দেশে ফেরানো কঠিন

বাংলাদেশ সরকার চাইলেও বেনজীরকে দেশে ফেরানো কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পুলিশ ইন্টারপোলে যে আবেদন করেছে, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নয়। তা ছাড়া তাকে গ্রেপ্তার করানোর পেছনে ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিরোধ রয়েছে। ফলে বিষয়টি দুবাই পুলিশ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে পারে।

বর্তমান ধর্মপ্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসেন কায়কোবাদ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় দণ্ডিত হয়ে দুবাইয়ে ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দেশে ফেরাতে পারেনি।

আবার দেশে হত্যামামলার আসামি আরাভ খান দুবাইয়ে আটক হলেও তাকেও পায়নি বাংলাদেশ। কারণ তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে ঢুকেছিলেন আমিরাতে।

বেনজীর দেশ ছাড়ার সময় বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করলেও এরপর তিনি তুরস্কের পাসপোর্ট ব্যবহার করে যাতায়াত করছিলেন বলে এশিয়া পোস্ট জানিয়েছে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়টি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমিরাতের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি তাদের আইন, আদালত, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যথাযথ নথিপত্রের ওপর নির্ভর করছে।

গালফ নিউজের সাবেক অ্যাসোসিয়েট এডিটর এবং দ্য অ্যারাবিয়ান পোস্টের এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, এখন যদি বেনজীরকে দুবাইয়ের আদালতে হাজির করা হয়, তাহলে তিনি জামিন আবেদন করতে পারেন।

আইনজীবীরা বলছেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তাও বিবেচনা করবে আমিরাতের আদালত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভর করবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইন শিথিল, এমন দেশের বড় উদাহরণ সংযুক্ত আরব আমিরাত। এটা বেনজীরের প্রত্যর্পণের রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে।

বেনজীরের নতুন ফন্দি

এদিকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ ঠেকাতে বেনজীর দুবাইয়ে ঘনিষ্ঠ একজনকে দিয়ে নিজের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন এবং তাতে আর্থিক অপরাধের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে এশিয়া পোস্ট।

এমন মামলা হলে তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত বেনজীর দুবাইয়েই থাকবেন। দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের তৎপরতা দেখে বেনজীর এই আইনি ফন্দি আঁটেন।

দুবাইয়ের এক ব্যবসায়ী এশিয়া পোস্টকে বলেন, বেনজীর আহমেদের আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বরং তার প্রত্যর্পণ ঘিরে নতুন করে আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই দুবাইয়ে একটি দেওয়ানি ও ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয় সংক্রান্ত অভিযোগে নতুন মামলা হয়েছে।

ওই ব্যবসায়ীর মতে, এই আইনি পদক্ষেপের লক্ষ্য বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ থামিয়ে দেওয়া। কেননা, দুবাইয়ে কারও বিরুদ্ধে আর্থিক বা সম্পত্তি-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে ফেরত দেওয়ার সুযোগ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনে নেই। ফলে এই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বেনজীরের দেশে ফেরানোর বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads