তারেক রহমান কি দিল্লি যাচ্ছেন?

কার্টুনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় তৈরি।
কার্টুনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় তৈরি।

ঢাকায় বৈঠকের পরই দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লিপানে ছোটা, আবার ‘র’ প্রধানের ঢাকায় আসা, সব মিলিয়ে তারেক রহমানের ভারত সফরের গুঞ্জন চলছিল, তারমধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বক্তব্য তা আরো জোরাল করল।

শামা ওবায়েদ বৃহস্পতিবার ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসলে অনেক সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত নয় বলে তিনি জানালেও তার কথায় একটি ইঙ্গিত স্পষ্ট, তাহলো ঢাকার চাওয়া হলো দ্বিপক্ষীয় সফর।

গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য বেছে নিয়েছিলেন মালয়েশিয়া। তবে কুয়ালালাপুর থেকে তিনি চীন সফরে যাওয়ায় তা যে দিল্লিকে অসন্তুষ্ট করেছিল, তা ভারতের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে যায়।

এরপর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানের কাছে ভারত সরকারের আমন্ত্রণপত্র আসে গত মাসে।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়; বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে।

এমন আমন্ত্রণে ঢাকা নাখোশ হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কথায় এই অসন্তোষের সুর ধরা পড়ে। তিনি গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে না, চেয়ারপারসন অব বিমসটেক দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।”

সেদিনই তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে যান বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এরপর তিনি ভারতে যান তার দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন।

এদিকে গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে, পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নাজুক হয়ে পড়ে। বিএনপি সরকার গঠনের পর তাতে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও তাতে শেখ হাসিনা এখনও কাঁটা হয়ে আছে।

এরমধ্যে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তা বিএনপি সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা এর নেপথ্যে দিল্লির ভূমিকা দেখছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সভায় বলেন, “দিল্লিতে যে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে, সেটি ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা যা কিছু বলছে, সেগুলো তার ভাষ্য হিসেবে না নিয়ে দিল্লির ভাষ্য হিসেবে নিতে হবে। ভারত এই বার্তা বাংলাদেশকে দিয়ে যাচ্ছে।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ফাইল ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

তিনি তারেক রহমানের সফরের বিরোধিতা করে বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কীভাবে হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নিরূপণ হবে— এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না।
ঠিক এদিনই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, তারেক রহমানকে দিল্লিতে নেওয়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে ভারত।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমান যদি ভারত সফরে যান তাহলে সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বিবিসি বাংলাকে বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে ঠিকই, তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তারেক রহমানের এই সফরে যাওয়া উচিত।

একই মত পোষণ করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমানও।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এমন যদি হতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন। পরের দিন ব্রিকসের আউটরিচে অংশ নিলেন, এটা হলে পারফেক্ট হতো। কেননা, ব্রিকসে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। সেদিক থেকে এই সফর বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”

শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে ঢাকা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা এড়ানো যেত বলে মনে করেন মাহফুজুর রহমান। কেন এড়াতে পারল না, তাও ‍তুলে ধরেন তিনি।

মাহফুজুর রহমান বলেন, “এই মুহূর্তে যারা বিরোধী দলে অর্থাৎ সংসদে অবস্থান করছে, তারা সম্ভবত কিছুটা কট্টরপন্থি। তাদের এই অবস্থানের কারণে, সরকার হয়তো অতটা সাহস পাচ্ছেন না এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রো-ইন্ডিয়ান একটা সিদ্ধান্ত নিতে।”

তারপরও তার মত হলো, শুধু সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়, যদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়, তাহলে ভারত সফরে যাওয়াই উচিৎ তারেক রহমানের।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads