“সে যখন বলল, ভাইসব।
অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল
সে যখন ডাকলো, ভাইয়েরা আমার
ভেঙে যাওয়া পাখির ঝাঁক ভিড় করে নেমে এল পৃথিবীর ডাঙায়”
এই সে হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে কথার জাদুতে কীভাবে বাঙালিকে এক সূত্রে গেঁথেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তা বোঝাতে এই কবিতা লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার বেঁচে যাওয়া দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে।
পাঁচ দশক পর শেখ হাসিনা আবার সেই ভারতে। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়ে তিনি প্রতিবেশী দেশটিতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। দেশে তার বিরুদ্ধে ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া। তারমধ্যেই ভারতের সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অচিরেই দেশে ফিরবেন এবং মাথা উঁচু করে।
আর তাতেই শুরু হয়ে গেছে তার দল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা। আর সেই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মাহফুজ আলম, যিনি পরে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারেও ছিলেন।
যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা উৎখাত হয়ে এখন নির্বাসনে, তা একটি ষড়যন্ত্রের ফসল বলে আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করে আসছেন। তবে পশ্চিমা দেশগুলো বেশ আগে থেকেই শেখ হাসিনার শাসনকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা দিয়েছিল।
অভ্যুত্থানের পর ইউনূসের সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথমে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে। এরপর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও দেয় নিষেধাজ্ঞা। ফলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে কার্যত নির্বাসনে। সেই কারণে নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার দুদিন আগে প্রকাশ করে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘মাথা উঁচু করে দ্রুত ফিরব: শেখ হাসিনা’।

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরবেন এবং ‘মাথা উঁচু করে’ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েই ফিরবেন।
তিনি হিন্দুস্থান টাইমসকে বলেন, ‘১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে আমি প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। আমাকে কোনো কিছুই থামাতে পারেনি। আল্লাহ যেহেতু আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাই আমি খুব শিগগিরই দেশের মাটিতে ফিরব।’
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগেরও ফিরে আসার ভবিষ্যদ্বাণী করে দলটির সভাপতি বলেন, অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আওয়ামী লীগ টিকে আছে এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও তার দলের কেউ স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি, বরং পরিস্থিতির কারণে তারা বাধ্য হয়েছেন।
শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশের পরদিন মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, আওয়ামী লীগ কার্যত দেশের রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। কেন তিনি তা মনে করছেন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি অন্তর্বর্তী সমরকারের সমালোচনা করেন, যার অংশীদার তিনি নিজেই ছিলেন।
ফেইসবুকে মাহফুজ লেখেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?
“লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ‘২৪ কে ‘৭১ এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেসে/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের ‘মজলুমগণ’/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে ‘মজলুমগণ’ চুপ ছিল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এদেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এদেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যুনতম সংস্কার ও ‘ঐকমত্য কমিশন’ নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে ‘বিএনপি ও *’ অন্তরীণ সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর ‘বিএনপি ও *’ ‘ ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরীণ।”
তিনি আরো লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা ‘প্রযোজিত’ হল/ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিকাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হল এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু হল। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল। নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।”
মাহফুজের এই পোস্ট নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় চলছে তুমুল আলোচনা। এরমধ্যে আবার তার শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, যিনি নিজেও ইউনূসের সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন।

আসিফ নজরুল লেখেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।”
একই রকম পোস্ট দেন অন্তর্বর্তী সরকার আমলে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ।
তিনি লেখেন, “লীগ ফেরত আসবে না। কিন্তু যে কারণে লীগকে মানুষ মরিয়া হয়ে হঠাতে চেয়েছে, সেই পুরোনো বন্দোবস্ত ফেরত এসেছে। যাদের উপলক্ষ করে মানুষ জুলাইয়ে মাঠ দখল করেছিল, তাদের দাবার ঘুঁটি বানিয়েই পুরোনো বন্দোবস্ত ফেরত এসেছে।”
ফিরোজ আহমেদ যে দলটিতে যুক্ত, সেই গণসংহতি আন্দোলনের মূল নেতা জোনায়েদ সাকি বিএনপির সমর্থন নিয়ে এবার সংসদ সদস্য হওয়ার পর প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন।
এদিকে মাহফুজের পোস্টের নিচেও অনেকে মন্তব্য করছেন। সেখানে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছেন, তখন সরকার থেকে তিনি কেন সরে দাঁড়াননি?
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ লিখেছেন, “যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থীদের পেট্রন (পৃষ্ঠপোষকতা) করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই সততার সাথে ইন্টেরিম থেকে সরে যেতে পারতেন। সেটা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।”
গত ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করায় সন্ত্রাস দমন আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে থেকে আসা শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি কটাক্ষ করে মাহফুজের পোস্টের নিচে মন্তব্য করেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ ভাংতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন এনসিপির কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।”



