ঢাকা সফর করে গেলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি। তার এই সফর বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে বড় কোনো খবর হয়ে ওঠেনি। তবে বিশ্লেষকদের চোখে এই সফর ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ঠেকছে, যে সফরে মাদক পাচার রোধে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
পাকিস্তানের ক্রিকেট দল এখন বাংলাদেশ সফর করেছে। এটাকে উপলক্ষ করেই দুই দিনের সফরে গত শুক্রবার ঢাকায় আসেন রাজা নাকভি। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান তিনি।
তবে শনিবার ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা। ইরান যুদ্ধের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রীর সফরকে নিছক শুভেচ্ছা সফর মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পরিবর্তিত পরিস্থিতি যেখানে মিডল ইস্ট, ইরান, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নতুন যে ভূ-কৌশলগত অবস্থান তৈরি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, সেটাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

“সুতরাং সবদিক মিলিয়ে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ করাটা অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার দিক থেকে দেখা প্রয়োজন।”
পাকিস্তানের শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করতে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। আর এজন্য ৩০ লাখ মানুষকে আত্মদান করতে হয়েছিল। সেই ইতিহাস সঙ্গী করেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যদিয়ে চলছিল।
তবে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নামমাত্র হয়ে পড়েছিল। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধরে বিচার নিয়ে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া সেই সম্পর্ক আরও নাজুক করে তোলে।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করতে উদ্যোগী হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়, বাণিজ্য, যোগাযোগ বাড়াতে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। বলা যায়, ঢাকা-ইসলামাবাদের এতটা উষ্ণ সম্পর্ক এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
বিপরীতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঠেকে তলানিতে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলার যখন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখনই ঢাকা সফরে এলেন রাজা নাকভি।
অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, “এই মুহূর্তে পাকিস্তান ওয়েস্ট এশিয়া অর্থাৎ ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে মধ্যস্থতায় আছে এবং সেই সাথে আফগানিস্তানের সাথে তাদের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে এবং চীনের সাথে তাদের যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে, এই প্রত্যেকটাকেই এই সফরটা রিফ্লেক্ট করে।”
আবার জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে আস্থা ও স্বচ্ছতা তৈরি হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, সমঝোতা স্মারকের আলোকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মাদক পাচার এবং মাদক সংক্রান্ত অর্থ পাচার রোধে একে অপরকে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং কারিগরি সহায়তা দেবে।
মাদক অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি, পাচারকারী সংস্থা এবং পাচারের নতুন পদ্ধতি ও রুট সম্পর্কে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও করবে দুই দেশ।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে।
তবে ভারতের সঙ্গে যখন সম্পর্কের নৈকট্য চাইছে বিএনপি সরকার, তখন পাকিস্তানের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা দিল্লি কোন চোখে দেখবে, তাও দেখার বিষয়। কারণ ভারত আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা হিসেবে দেখে পাকিস্তানকে।
এনিয়ে অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, দুই কূলই রক্ষা করতে হবে বাংলাদেশকে।
তার ভাষ্যে, “বাংলাদেশের জন্য ভারত যেরকম গুরুত্বপূর্ণ, পাকিস্তানও আঞ্চলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পাকিস্তানের সাথে মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য যে সম্পর্ক সেটাও বাংলাদেশের জন্য বিবেচ্য, খুবই বিবেচ্য।”



