বিতর্ক যেন মাহফুজ আনামের পিছুই ছাড়ছে না। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সঙ্গে সংশ্রব নিয়ে দুই দশক আগে বিতর্কে পড়েন ডেইলি স্টার সম্পাদক। এরপর আবার তখন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ডিজিএফআই পরিবেশিত সংবাদ যাচাই ছাড়া প্রকাশ করার স্বীকারোক্তি দিয়ে পড়েন সমালোচনায়।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে গদগদ প্রশংসায় ভাসিয়ে নতুন করেন বিতর্কে পড়েন মাহফুজ আনাম। এরপর ওই সরকার আমলে যখন ডেইলি স্টার ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সোশাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ট্রলের বন্যা বয়ে যায়।
এবার আরেক সম্পাদক নঈম নিজামের একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে আলোচনায় রয়েছেন মাহফুজ আনাম। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম দাবি করেছেন, ১৯৯১ সালের পর শেখ হাসিনা যখন বিরোধীদলীয় নেতা, তখন এক ঘটনায় তাকে নিয়ে খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দারের (বর্তমানে প্রয়াত) বাসায় গিয়েছিলেন মাহফুজ আনাম।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম গত ১৪ মে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এই ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন।
তার দাবি, একবার দুই নেত্রীর একটি কঠিন ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল সাঈদ ইস্কান্দারের দুই সন্তানের ওপর ধানমন্ডিতে হামলার ঘটনাকে ঘিরে। ৩২ নম্বরের সড়ক বন্ধ থাকায় ওই দুই কিশোর একদিন গাড়ি থেকে নেমে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে কটূক্তি করেছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই জন বেরিয়ে এসে তর্কাতর্কির পর সাঈদ এস্কান্দারের দুই ছেলেকে লাঞ্ছিত করে। তখন তারা গিয়ে তাদের ফুফু, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে বিচার দেয়। তাতে খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ হন।
নঈম নিজাম লিখেছেন, ঘটনার দিন শেখ হাসিনা রংপুরে ছিলেন। তিনি ফিরে এসে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন এবং তাদের চাকরিচ্যুত করেন। পরদিন শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি সাঈদ এস্কান্দারের বাসায় যাবেন।
“শেখ হাসিনা ফোন করেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। তিনিও যোগ দেন। সঙ্গে নেন ক্যামেরাম্যান স্বপন সরকারকে। সবাইকে নিয়ে শেখ হাসিনা যান সাঈদ এস্কান্দারের বাসায়। মাহফুজ আনাম ওঠেন শেখ হাসিনার গাড়িতে।”
নঈম নিজামের ভাষ্যে, সাঈদ এ স্কান্দার তখন বাসায় ছিলেন না। বাসায় শেখ হাসিনা পৌঁছনোর পর তার দুই ছেলে সামনে আসতেই তাদের জড়িয়ে ধরেন তিনি। চকলেট দেন। কোলে তুলে নিয়ে গল্প শুরু করেন।
“মাহফুজ আনামের পরামর্শে মৃণাল একটি ছোট টেপ রেকর্ডার চালুকরে দেন, যাতে শুরু থেকে পুরো কথোপকথন রেকর্ডেরাখা যায়।
এরপর শেখ হাসিনা সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মাহফুজ আনামসহ অন্যদের নিয়ে ফিরে আসেন বলে জানান নঈম নিজাম।
নঈম নিজামের এই পোস্ট নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় সংবাদকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সাংবাদিক মুক্তাদির মুক্তাদির রশীদ লিখেছেন, “বাংলাদেশে এক সময়ে সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের সহযোগী নঈম নিজাম এক ফেবুপোস্টে অভিজাত সাংবাদিকের অভিভাবক ও ১/১১ র সহযোগী হিসেবে নিন্দিত সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ভাবে নতুন ওয়াটারগেটের মতো গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ এনেছেন।”
তিনি আরো বলেন, “সংবাদকর্মী হিসেবে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। একজন সম্পাদক কিভাবে বিরোধীদলের হয়ে অন্যের গোয়েন্দাগিরি করতে রাজনীতিদের পরামর্শ দিচ্ছেন। নৈতিকভাবে এটা গর্হিত। কারণ তিনি এখানে নেগোশিয়েটরের ভুমিকায় কেবল অবতীর্ণহননি, বরং সাধারণ নাগরিকের উপর গোয়েন্দাগিরি করতে রাজনীতিবিদদের উস্কেছেন।।
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, “তাহলে কি মাহফুজ আনাম সাহেবের কাজ ছিলো শেখ হাসিনার পিআর দেখা? কোন পেশাদারি এখতিয়ারে উনি হাসিনার ফোন কল পেয়ে তার সাথে ওই বাসায় গেলেন? হাসিনার সাথে কারো বিরোধ মীমাংসা কি উনার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?”
আবার দ্য ডিসেন্ট সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির এই তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে লিখেছেন, “সিনিয়র সাংবাদিক নঈম নিজাম সাহেবের গপ্পে ঝালেমা আছে। তিনি বলেছেন, ১৯৯১-৯৬ এর সংসদের গপ্প করছেন। এবং তখন নাকি খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এ স্কান্দার এমপি ছিলেন। কিন্তু অনলাইনে যাবতীয় সোর্সে দেখা যাচ্ছে, ২০০১ সালের আগে এস্কান্দারের এমপি হওয়ার কোন রেকর্ডনেই।
সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজামের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সম্পাদক পরিষদের সাবেক সভাপতি মাহফুজ আনাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমার এ খানে যাওয়া শুধু অসত্য না, একেবারে ” কাল্পনিক।
এই সংক্রান্ত আলোচনায় না গেলেও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আরশাদ মাহমুদ সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আনামের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সম্পাদক পদে তার থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আরশাদ মাহমুদ লিখেছেন, “আপনাদের হ য়তো মনে আছে, ১/১১র সময় মাহফুজ আনাম ডিজিএফআই এর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই না করে তার পত্রিকায় ছেপেছে। পরে এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এটা তার মস্ত বড় ভুল ছিল। ভেবেছিলাম এরপর তিনি হয়তো পদত্যাগ করবেন। তিনি সেটা করেননি। এরপর যখন কুখ্যাত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজির আহমেদের বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে খবর ছাপা হল, তখন তিনি বললেন আমরা এগুলো সবই জানতাম কিন্তু ভয়ে ছাপিনি।
“অথচ তার পত্রিকার উপরে লোগোতে লেখা আছে ‘Without fear or favour’। এরপরও ন্যূনতম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন একজন মানুষ কিভাবে এই পদ ধরে রাখতে পারে, সেটা আমি বুঝতে পারি না।”



