নব্য ফাটাকেষ্ট কথন

ব্যঙ্গচিত্রটি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি।
ব্যঙ্গচিত্রটি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজকাল নতুন এক পেশার জন্ম হইছে—‘ভেরিফায়ার’!

কে দেশে ফিরবো, কে ফিরবো না; কোন নেতা, কোন নেত্রী কী বলছেন, ক্যান বলছেন; কোন কথার ওজন কত কেজি- সবকিছু ভেরিফাই করার জন্য একেকজনকে নব্য ফাটাকেষ্ট হাজির করা চাই। এমনই এক রাজনৈতিক ফাটাকেষ্ট আমাদের আরাফাত সাহেব। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ঘোষণা দেওয়ার পরও তিনি যখন ‘১১০ শতাংশ’ নিশ্চয়তা দেন, তখন মনে হয় রাজনীতির বাজারে শতভাগে আর পোষায় না। দশ ভাগ বোনাস নিশ্চয়তাও লাগে!

যাকগে, শুরু করি আরেক জায়গা থাইক্যা।

১.

অবশেষে ‘ডাক্তার আইজুদ্দিনের’ লগে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিছে এ-টিম। ফেইসবুকে যারা কমবেশি অ্যাক্টিভিজম করেন তাগোর আইজুদ্দিনরে না চেনার কতা না। আইজু নামেও পরিচিত। মুখ ঢাইক্যা শুদ্ধ বাংলায় তেলাইয়া তেলাইয়া কথা কইতে দেখার কথা। আইজুরে অবশ্য কোনো কালেই আমার বিশেষ পছন্দ হয় নাই। মুখোশ পইরা চুরি-ছিনতাই-ডাকাতি করা যায়, কিন্তু অ্যাক্টিভিজম করতে গেলে কিন্তু বেখাপ্পা লাগে। সমাজ বদলাইবেন, কিন্তু সমাজ জানব না আপনি কেডা- এই সমীকরণ আমার মোটা মাথায় কোনোদিনই ঢোকে নাই।

এই কথা আমি এ-টিমের ‘কোর মেম্বারদের’ বহুবার কইছি। আমার মতো আরও অনেক নাখান্দারও সম্ভবত তারে পছন্দ করেন না। কিন্তু আইজুদ্দিনের লগে সম্পর্ক ছিন্ন করার হেতু যদি হয় তিনি আরাফাত আলীরে সমর্থন করেন নাই- তাইলে এই মামলায় আমি আইজুদ্দিনের পক্ষেই সাক্ষী দিমু।

কারণ আরাফাত সাহেবরে নিয়া আমার সংশয়ের জায়গা আইজকার না। মনে আছে তো সেই নির্বাচন?

একদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, অন্যদিকে হিরো আলম। বাংলাদেশের রাজনীতির কী এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত! যে দলের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, কামারুজ্জামান- সেই দলের প্রার্থীকে ভোটের মাঠে ঘামাইতেছেন হিরো আলম!

উইড়া আইসা জুইড়া বসলেই সবাই নীতিনির্ধারক হয় না। রাজনীতি ফেসবুকের ব্লু-টিক না যে আজ আবেদন করলেন, কাল ভেরিফাইড!

শেষমেশ জয় আসল। কিন্তু সেই জয়ের চেয়ে বড় হইয়া দাঁড়াইল অস্বস্তি। নির্বাচন নিয়া কারচুপির অভিযোগও উঠল প্রবলভাবে। অর্থাৎ হিরো আলম হারলেন ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কে কাকে হারাইল- সেই হিসাবটা আজও আমার কাছে পরিষ্কার না। সেই আরাফাত সাহেব এখন আবার বড় বড় রাজনৈতিক বিষয়ে ‘১১০ শতাংশ’ নিশ্চয়তা দেন!

ভাইরে, ১০০ শতাংশে কী সমস্যা আছিল? বাকি ১০ শতাংশ কি রাজনৈতিক সার্ভিস চার্জ?

সবচেয়ে মজার বিষয় হইল, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না- এই তথ্য নিশ্চিত করার মানুষ কি আসলেই আরাফাত? শেখ হাসিনা যদি নিজেই বলেন তিনি দেশে ফিরবেন, এরপর আরাফাত সাহেবের সার্টিফিকেট কেন লাগবে? সব দেইখ্যা মনে হইতাছে, নেত্রীর ঘোষণার নিচে এখন থেকে লিখতে হবে- “উপরোক্ত বক্তব্য আরাফাত কর্তৃক যাচাইকৃত”?

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থাকলে বরং বলা যাইত- নেত্রী নিজে যখন বলেছেন, এরপর আমার আর কিছু বলার নাই। ব্যস। কিন্তু না। আমাদের ১০০ শতাংশে চলে না। আমরা দেই ১১০ শতাংশ!

এইখানেই এ-টিমের ভাইদের ওপরও আমার একটু গোস্যা আছে। গোস্যা নিয়েন না ভাইয়েরা। আপনারা সম্ভবত মানুষ চিনতে গিয়া মাঝেমধ্যে ‘সফটওয়্যার আপডেট’ দিতে ভুইলা যান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দেশে ফেরা বা না ফেরার তথ্য নিশ্চিত করার জন্য এমন কাউরে হাজির করার দরকার নাই, যার নিজের রাজনৈতিক ওজন নিয়াই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আছে।

উইড়া আইসা জুইড়া বসলেই সবাই নীতিনির্ধারক হয় না। রাজনীতি ফেসবুকের ব্লু-টিক না যে আজ আবেদন করলেন, কাল ভেরিফাইড! আরেকটা কথা। যারা এইসব নব্য ফাটাকেষ্টদের বারবার আলোচনার কেন্দ্রে ডাকেন, তাগোর রাজনৈতিক রুচি নিয়াও মাঝেমধ্যে আমার সন্দেহ হয়। রুটি ভাগাভাগি বুঝি। ক্ষমতার ভাগাভাগিও কমবেশি বুঝি। চেয়ার ভাগাভাগি বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো ঐতিহ্য- সেইটাও বুঝি। কিন্তু আদর্শ ভাগাভাগির নামে যদি শেষ পর্যন্ত আদর্শটাই টুকরা টুকরা কইরা ফেলেন, তাইলে হাতে থাকবে শুধু রুটি আর চেয়ার। রাজনীতি থাকবো না।

২.

এবার আসি আমাদের আরেক জাতীয় বিনোদনে- ‘থাপ্পড়ম্যান’। ভাইসব, থাপ্পড়ম্যানরে লইয়া এত লাফাইয়েন না।

মানুষের শরীরের বাইসেপ কত ইঞ্চি, বুক কত ইঞ্চি- এইসব মাপার আগে মগজের ব্যায়াম কতটুকু হইছে, সেইটাও মাঝেমধ্যে মাপা দরকার। আমাদের দেশে পেশির একটা আলাদা কদর আছে। বাইসেপ দেখলে আমরা মুগ্ধ হই। বুকের ছাতি দেখলে সাহসী ভাবি। জিমের ছবি দেখলে মনে করি- জাতির ভবিষ্যৎ নিরাপদ হাতে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। শরীরের ছয়টা প্যাক দেখা যায়। মগজের প্যাক দেখা যায় না।

বাচ্চারে মাদরাসায় পাঠানোর আগে থাপ্পরম্যানের সচেতনতা কই আছিলো তা আমার মনের মইধ্যে ঘোরপাক খাইতাছে। আমি কইতাছি না যে, সন্তান মাদরাসায় পড়ে বলেই তার সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেছি! আমি প্রশ্ন তুলতেছি কারণ- আপনে নিজের শরীর লইয়া যতটা না সচেতন, নিজের সন্তান লইয়া সেই সচেতনতাটা ক্যান দেখাইতে পারলেন না!

আমরা শরীর গঠনের জন্য জিম খুঁজি, ট্রেইনার খুঁজি, প্রোটিন খুঁজি। মগজ গঠনের বেলায় “আল্লাহ ভরসা!”

আমরা শরীর গঠনের জন্য জিম খুঁজি, ট্রেইনার খুঁজি, প্রোটিন খুঁজি। মগজ গঠনের বেলায় “আল্লাহ ভরসা!”

তারপর সেই মগজ নিয়াই আমরা রাজনীতি করি, সমাজ চালাই, ফেসবুকে বিপ্লব করি এবং সুযোগ পাইলে অন্যের বক্তব্যও ‘১১০ শতাংশ’ ভেরিফাই করি!

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণপোকা। শরীর গঠনের আগে অথবা অন্তত পাশাপাশি মগজ গঠনের কথাটাও ভাবেন। নইলে নব্য ফাটাকেষ্টের সংখ্যা বাড়তেই থাকবো।

কেউ থাপ্পড়ের জোরে ফাটাকেষ্ট। কেউ মাইকের জোরে। কেউ ফেসবুকের জোরে। আর কেউ কেউ ‘১১০ শতাংশ’ নিশ্চয়তার জোরে!

ভালো থাইক্যেন। আর গোস্যা নিয়েন না।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads