নতুন রাষ্ট্রপতি মনে করিয়ে দিচ্ছে পুরনো আরেক রাষ্ট্রপতিকে

নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বিএনপির মনোনয়নে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী।
নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বিএনপির মনোনয়নে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী।

সজ্জন রাজনীতিক, সদালাপী, সংস্কৃতিমনা- এমন সব বিশেষণেই পরিচয় পাচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একটু যদি পেছনে তাকাই, তবে একই বিশেষণের আরেকজন রাষ্ট্রপতিকে পাওয়া যাবে। তিনি হলেন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

এই বিশেষণগুলোই নয়, তাদের আরো মিল খুঁজে পাওয়া যায় দলীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। দুজনই বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে এই দুজনই কেবল বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

বদরুদ্দোজা চৌধুরী, যিনি বি চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত, তিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠনের পর প্রথম মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন চিকিৎসক বি চৌধুরীকে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠনের পর বি চৌধুরী সেই সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারেও প্রথমে মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। এরপর ওই বছরের ১৪ নভেম্বর তিনি বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলাপ আছে, তখন বি চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করতে নিমরাজি ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু বিকল্প কাউকে না পাওয়ায় বি চৌধুরীকে মেনে নিতে হয়েছিল তাকে।

বি চৌধুরীকে পদত্যাগে বাধ্য করার আগে প্রধান প্রধান সংবাদপত্রের শিরোনামে ঘুরেফিরে এসেছে তার নাম।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে বি চৌধুরীর অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। বিএনপিতে প্রবল বিরোধিতার মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন তাকে পদত্যাগ করে সরে যেতে হয়। অর্থাৎ তিনি এক বছরও বঙ্গভবনে থাকার সুযোগ পাননি।

কেন সরে যেতে হয়েছিল

২০০২ সালের জুন মাসের মাঝামাঝিতে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল যে বি চৌধুরী আর থাকতে পারছেন না রাষ্ট্রপ্রধানের পদে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, তাকে ইম্পিচমেন্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বিএনপি থেকে। তখন তিনি মানে মানে পদত্যাগ করে সরে পড়েছিলেন।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান বি চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদটির নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছিলেন, তাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ খালেদা জিয়া চেয়েছিলেন একজন অনুগত রাষ্ট্রপতি।

বি চৌধুরীর ওপর বিএনপির বিরাগভাজন হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণ তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছিল। তার মধ্যে রয়েছে- জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিতে ফুল দিতে না যাওয়া, রাষ্ট্রপতির বাণীতে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক না বলা, রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ না বলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আফতাব আহমদকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো ফাইলে সই না করা, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করা, খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য এক মাস যুক্তরাষ্ট্রে থেকে ফেরার পর তার খোঁজ-খবর না নেওয়া ইত্যাদি।

তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সরকারি গণমাধ্যমে বেশি প্রচার পাচ্ছেন বলেও বিএনপি নেতারা মনে করছিলেন। পদত্যাগের চার বছর পর ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বি চৌধুরী বলেছিলেন, “আমি রাষ্ট্রপতি হবার পরে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে আবেদন জানালো আমি যেন চ্যান্সেলর হিসেবে সেখানে ডিগ্রিগুলো দিতে যাই। আমি সেগুলো করেছি। কিছুদিন পরে একজন মন্ত্রী আমার কাছে এলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে বললেন যে আমি যেন এত বেশি এক্সপোজড না হই।”

বি চৌধুরীকে নিয়ে এমন সব অসন্তোষের প্রকাশ ঘটে ২০০২ সালের ১৯ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে, যার সভাপতিত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে বি চৌধুরীকে অভিশংসন বা ইম্পিচ করার হুমকি আসে।

ওই সভার আলোচনা নিয়ে তখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সভায় এ সংক্রান্ত আলোচনার সূত্রপাত করেন। সভায় বিএনপির ১৫ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন, সবার সুর ছিল এক।

বি চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের দাবিও তুলেছিলেন তখনকার বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার মুন্সীগঞ্জ সফরের সময় তাকে স্বাগত জানিয়ে বি চৌধুরীর ছেলে, তৎকালীন সংসদ সদস্য মাহি বি চৌধুরীর তোরণ নির্মাণের প্রসঙ্গও আসে সভায়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদীয় দলের সভায় বিএনপির একজন সংসদ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রেসিডেন্টের পুত্র বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য তোরণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি এ ধরনের তোরণ নির্মাণ শুরু করি, তাহলে কেমন হবে?”

ওই সভার খবর প্রকাশের পরপরই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এর পরদিন বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শেষে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে আহ্বান জানানো হয়। তৎকালীন চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষর করা একটি চিঠি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছিলো, “১৯ এবং ২০ জুন দলের সভায় বিস্তারিত আলোচনার পরে এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বিএনপি সংসদীয় দল মাননীয় প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উপরে আস্থা হারিয়েছে বিধায় তাকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহবান জানানো হচ্ছে।”

সংসদীয় দলের সভা চলার সময় রাষ্ট্রপতির ছেলে মাহি বি চৌধুরী বৈঠক থেকে বেরিয়ে টেলিফোনে বাবাকে সভার মনোভাব জানিয়ে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। দৈনিক ইত্তেফাকে মাহিকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছিল, “আব্বা, তোমার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই, তোমার পদত্যাগ করাই ভালো।”

এরপর ২১ জুন দেশের সবগুলো সংবাদপত্রে প্রধান শিরোনাম ছিল- রাষ্ট্রপতি আজ পদত্যাগ করবেন। সে দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমাহীন ব্যাপার। ভুলেরও একটা মাত্রা আছে। তিনি সে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।”
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বলেছিলেন, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। কিন্তু তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে পদত্যাগ করেন বি চৌধুরী। বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি বলেন, তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের সঙ্গে তার একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তার আক্ষেপ ছিল, তার সম্পর্কে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছিল, সেসব বিষয়ে তার বক্তব্য কেউ শোনেনি। খালেদা জিয়াকে তিনি ফোন করলেও তা ধরেননি।

২০০৬ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বি চৌধুরী বলেছিলেন, “প্রথম কথা আমি দলের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করি নাই, আর দ্বিতীয়ত, আমি তো দলে ছিলামই না! আমি তো নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করে এসেছি, সুতরাং আমি দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেভাবে কাজ করা উচিত ছিল, সেভাবেই কাজ করেছি।’

অতঃপর

রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পর বি চৌধুরী বিকল্প ধারা নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সেই দলের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়ার মুখে মহাখালীতে রেললাইন ধরে তার পশ্চাৎপসরণ ছিল আলোচিত এক ঘটনা।

২০০২ সালে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বি চৌধুরীর বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার ছিলেন, তাদের একজন ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অলি আহমদ।

দলের ভেতরে তীব্র বিরোধিতার মুখে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন বি চৌধুরী। পরে অবশ্য নতুন দল গঠন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হন বিএনপির এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

চার বছর পরে আবার তিনিই বিএনপিছাড়া হয়ে বি চৌধুরীর সঙ্গে মিলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। তবে এক বছর পর ২০০৭ সালে বি চৌধুরী এই দল থেকে বেরিয়ে আবার বিকল্প ধারা নিয়ে সক্রিয় হন। ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই দলের সভাপতি ছিলেন।

মজার বিষয় হলো, এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অলি আহমদ। মুক্তিযোদ্ধা অলিকে প্রার্থী করেছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। তবে সংসদে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি হেরে যান।

বি চৌধুরী ও ফখরুলের অনেক মিলের মধ্যে একটি হলো দুজনই রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বি চৌধুরীর বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিনও ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য।

তবে অমিলও আছে। বি চৌধুরীর বাবা যেখানে ছিলেন মধ্য-বাম দল আওয়ামী লীগে, সেখানে ফখরুলের বাবা ছিলেন ডানপন্থি মুসলিম লীগে। আবার বি চৌধুরী সরাসরি মধ্য-ডান দল বিএনপিতে ভিড়লেও ফখরুল সেখানে ভেড়ার আগে ছিলেন বাম বলয়ে। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করার পর তিনি কিছুদিন ন্যাপেও ছিলেন।

বি চৌধুরী নিজেকে যে সঙ্কটে ফেলেছিলেন, মির্জা ফখরুল যে তাতে সচেতন রয়েছেন, তা তার তৎপরতায় দৃশ্যমান। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই তিনি জিয়া ও খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। এখন দেখার বিষয়, বি চৌধুরীর সঙ্গে ফখরুল অমিল বাড়িয়ে তুলবেন, না কি আবার নতুন মিল তৈরি করবেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads