জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি কে? এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের খুব কম মানুষেরই জানা। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়, পরবর্তী সভাপতি কে? সেই উত্তর এখন অধিকাংশেরই জানা। তিনি খলিলুর রহমান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটিতে তিনি সাইপ্রাসের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৯৯-৯১ ভোটে হারিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে এক বছরের জন্য দায়িত্ব নেবেন তিনি।
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন নিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার সভাপতি হয়েছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। জাতীয় পার্টির সেই আমলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালে সংসদের স্পিকারও হন।
এবার দায়িত্ব নিতে যাওয়া খলিল বিতর্কিত এক চরিত্র। নানা কেলেঙ্কারিতে দুই যুগ আগে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়া খলিল সেখানে রজার খলিল নামে পরিচিত ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূস সরকার গঠনের পর খলিলকে নিয়ে আসেন দেশে।
ইউনূস প্রথমে খলিলকে তার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাইরিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এর কয়েক মাস পর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে বসান।
তখন বিএনপি তার এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই খলিলকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দেন তারেক রহমান। ফলে প্রশ্ন ওঠে- খলিল আসলে কার লোক? গুঞ্জন ছিল, ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার পেছনে কলকাঠি নেড়েছিলেন খলিল। তারপর দেশ ছাড়লেও খলিলের সঙ্গে বিএনপির গাঁটছাড়া যে থেকেই গিয়েছিল, তা এখন বলছেন অনেকেই।
খলিলকে এবার ইউনূস দেশে আনার পরপরই তার বিতর্কিত অতীত সামনে এনেছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আরশাদ মাহমুদ। খলিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ঠিক আগে তা নিয়ে আবার লিখেছেন তিনি।
আরশাদ মাহমুদের দাবি, খলিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ায় বাংলাদেশের কোনো লাভই হবে না।
কেন এমনটা মনে করেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুরুতেই খলিলকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, “এ খবরটি আমি যখন প্রথম শুনি, তখন একটাই কথা ভাবছিলাম যে এরকম একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে তারেক রহমান কোন উদ্দেশ্যে মনোনয়ন দিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ইউনূসের আমলে নিয়োগ পাওয়া খলিল বর্তমান সরকারেও মন্ত্রী হয়েছেন। অনেকের ধারণা তিনি হয়তো অত্যন্ত এফিশিয়েন্ট এবং সফল।
“তবে গত দু বছরে তার সফলতা কী, সেটা আমরা কেউ জানি না। খুব জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে আমেরিকার সঙ্গে দহরম- মহরমের কারণে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হাব ভাব দেখে মনে হয় হোয়াইট হাউস বা আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে যারা কাজ করেন, তারা খলিলের পরামর্শ ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নেন না। তবে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ, পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়ে ইউনুস সরকারে তিনি কী সাফল্য অর্জন করেছেন, সেটা ঠিক জানি না। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে গত তিন মাসে তার কি অর্জন সেটাও এখনো পরিষ্কার না।”
হুমায়ুন রশীদের প্রসঙ্গ ধরে আরশাদ মাহমুদ লিখেছেন, “১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়েছিলেন। তখন আমাদের বলা হয়েছিল যে এই পদ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং বিশ্ববাসী আমাদেরকে সম্মান করবে। বাস্তবে কিছুই হয়নি। আমি তার সাক্ষী। তখন এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছিলাম। আপনাদের হয়তো মনে আছে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত হন।”
সাংবাদিক হিসেবে বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন কাভার করার অভিজ্ঞতা থেকে আরশাদ মাহমুদ বলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি একটা গুরুত্বহীন পদ। প্রতিবছর একজন করে নির্বাচিত হন ভোটাভুটির মাধ্যমে। কিন্তু কেউ জানে না বা জানার চেষ্টাও করে না যে তিনি কোন দেশের বা তার নাম কী? যেমন বর্তমান সভাপতির নাম কি বা কোন দেশের কেউ কি জানেন?
“এই পদে নির্বাচিত হলে জাতিসংঘ থেকে তার বেতন-ভাতা কোনো কিছুই দেওয়া হয় না। এটা স্বাগতিক দেশ বহন করে। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর ১৯৮৬ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ব্যক্তি হুমায়ুন রশীদ এবং তার সঙ্গে যে সব অফিসাররা সেখানে পোস্টেড থাকে, তাদের কিছু আয় উন্নতি হয়। সেই সময় বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকজন অফিসারকে হুমায়ুন রশীদের টেম্পোরারি সেক্রেটারিয়েটে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই গরীব দেশের ট্যাক্সপেয়াররা তার সমস্ত খরচ বহন করে।”
খলিলের কারণে দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কার কথাও বলেন আরশাদ মাহমুদ। তিনি লিখেছেন, “আমার আশঙ্কা হচ্ছে, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম যদি খলিলুর রহমান সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয় তখন তার বহুল আলোচিত পরকীয়ার সম্পর্ক এবং পরিণতিতে একটা চাঞ্চল্যকর খুন-আত্মহত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসতে পারে। সেটা কি দেশ বা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো হবে?”
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



