“জমে উঠেছে প্রথম আলো বনাম কালের কণ্ঠ ক্লাসিকো! আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ!” ফেইসবুকে লিখেছেন একজন। আরেকজন হাসির ইমোজি দিয়ে লিখেছেন- “আমি মোটামুটি (মিডিয়া-মিডিয়া খেলা) এই যুদ্ধ দেখার জন্য পপকর্ণ নিয়া বসছি, ভালই ” লাগতাছে।
হালে বাংলাদেশে দুই সংবাদপত্রের রেষারেষিতে এমন নিচ্ছে পাঠককূল। এটাই পাঠকদের বোঝা হয়ে গেছে, এটি শুধু দুই পত্রিকার রেষারেষি নয়, এর পেছনে এদের মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ ও ট্রান্সকম গ্রুপের দ্বন্দ্বও আছে।
কোনো সংবাদমাধ্যমে খবর হিসেবে উঠে না এলেও সোশাল মিডিয়ায় এ নিয়ে চলছে বেশ আলোচনা। এই জমানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো সবই বোঝে। তাই এই দ্বন্দ্ব নিয়ে মতামত চাইলে চ্যাটজিপিটি বলল, প্রথম আ লো বনাম কালের কণ্ঠের দ্বন্দ্ব কেবল দুই পত্রিকার বিরোধ নয়। এটি বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো পুনর্বিন্যাসের একটি প্রতীকী প্রতিফলন, যেখানে সংবাদমাধ্যম একই সঙ্গে খেলোয়াড়, অস্ত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্র।
আর জেমিনি মতামত দিল- “প্রথম আলো ও কালের কণ্ঠের (বা ট্রান্সকম ও বসুন্ধরা) এই রেষারেষি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে “গণমাধ্যম এখন আর কেবলই চতুর্থস্তম্ভ বা জনকল্যাণের মাধ্যম নয়, বরং এটি করপোরেট সাম্রাজ্য রক্ষার একটি ঢাল ও তলোয়ার”।
ট্রান্সগ্রুপের মালিকানায় ১৯৯৮ সালে প্রথম আলোর প্রকাশ শুরু হয় সম্পাদক মতিউর রহমানের হাত দিয়ে। তিনি এখনও এই পত্রিকার সম্পাদক। এই গ্রুপের মালিকানায় আছে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার। তার বর্তমান সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই দুই সম্পাদকই বিতর্কে পড়েছিলেন।
অন্যদিকে বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কণ্ঠের প্রকাশ শুরু হয় ২০১০ সালে। প্রথমে আবেদ খান ছিলেন এর সম্পাদক। তবে এই পত্রিকার সম্পাদক বদল মিউজিক্যাল চেয়ারের মতোই হয়ে আসছে। এখন সম্পাদকের পদে আছেন হাসান হাফিজ, যিনি বিএনপি সমর্থক সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হয়ে বসেছেন।
কালের কণ্ঠের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুেপর হাতে রয়েছে বাংলা দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান, অনলাইন সংবাদপত্র বাংলানিউজ, টিভি চ্যানেল নিউজ ২৪ ও টি স্পোর্টস।
কালের কণ্ঠ প্রকাশ শুরুর পর থেকে প্রথম আলোকে নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যা বিদ্বেষমূলক বলে সমালোচনা ওঠে। এনিয়ে প্রেস কাউন্সিলে প্রথম আলো অভিযোগ করলে কালের কণ্ঠকে ভর্ৎসনাও করা হয়।
সম্প্রতি সরকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নিলে প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল- ‘বসুন্ধরা যেন রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র।’
তাতেই ক্ষেপে ওঠে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া, যে কোম্পানির অধীনে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য সান, বাংলানিউজে প্রকাশিত হয় মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামকে নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন।
এসব প্র তিবেদনে ওয়ান-ইলেভেনে এই সম্পাদকের ভূমিকা নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কলুষিত চরিত্রের মানুষ হিসেবে দেখানোর হোতা এই দুজনই। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ শাসনের সুবিধাভোগী হিসেবেও তাদের দেখানো হচ্ছে, যদিও শেখ হাসিনার আমলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার দুটি পত্রিকাই ছিল চাপে।
এর মধ্যে আবার সম্পাদক পরিষদ, যা গঠনের উদ্যোক্তা হিসেবে মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামকে মনে করা হয়, সেই পরিষদের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নতুন সংগঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এই উ দ্যোগে যুক্ত আছেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক আবুতাহের, ডেইলি সান সম্পাদক রেজাউল করীম লোটাস।
তার আগেই প্রথম আলোকে নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকাগুলোতে প্রতিবেদন আসতে থাকে। তা নিয়ে একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, দুই দিন আগে প্রথম আলো একটা নিউজ করছিলো- “বসুন্ধরা যেন রাষ্ট্রের ভিতর আরেক রাষ্ট্র!” এরপর কালের কণ্ঠ মোটামুটি প্রথম আলোর ন্যারেটিভ, ভুয়া নিউজ থেকে শুরু করে মালিক-সম্পাদকের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে।
এখন পর্যন্ত কালের কন্ঠ ১১/১২টা ফটোকার্ডতৈরি করছে প্রথম আলো নিয়ে।
আরেকজন লিখেছেন, “বসুন্ধরা যেন রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র – এই শিরোনামের খবরে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যাপারে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করে প্রথম আলো। সেখানে কালের কণ্ঠের অনেকে কমেন্ট করে প্রতিবাদও জানায়। যেহেতু এটা বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া।
“তবে এখানেই শেষ না! এরপর একের পর এক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে প্রচার করতেই আছে কালের কণ্ঠ। যার মূল থিম- বিএনপি বা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে প্রথম আলো যা যা লিখেছে, তা নতুন করে প্রকাশ্যে আনা। দর্শকরাও বেশ মজাই পাচ্ছে! শেষ পর্যন্ত কে কয় গোলে এগিয়ে যায় দেখা যাক! তবে মিডিয়া মিডিয়া কামড়াকামড়ি একপ্রকার খারাপ না। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, অল্প বিস্তর হলেও তাদের অপকর্ম জানতে পারি আরেকটু! চলুক এই আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ!“
একজন লিখেছেন, “অবস্থা এমন, প্রথম আলো হাত দিয়েছে বসুন্ধরার আবাসন প্রকল্পে। কালের কণ্ঠ হাত দিয়েছে প্রথম আলোর অফিস, মালিকপক্ষসহ সবকিছু নিয়ে। দেশের বড় দুইটা গণমাধ্যমের এই খোঁচাখুচি হালকাভাবে দেখার উপায় নাই। নিশ্চিতভাবেই ঘটনার গভীরে আরও ঘটনা আছে। ব্যাটেল এখানে শুধুকালের কণ্ঠ বনাম প্রথম আলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না। মূল ঘটনা মনে হচ্ছে বসুন্ধরা বনাম বিএনপিতে।
“ঘটনা যাই হোক, এলিটদের গুতোগুতি দেখতে ভাল লাগছে। এইসব এলিট আর বড় বড় গ্রুপগুলোই দেশের রাজনীতির সিস্টেমকে জিম্মি করে রাখে। আর গণমাধ্যমগুলোও নিজেদের প্রয়োজনে কীভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করে। একদম পানির মত পরিষ্কার বোঝা যায়।”
কেউ কেউ লিখছেন, কালের কণ্ঠ অপসাংবাদিকতা করছে। আবার কেউ বলছেন, কালের কণ্ঠ যা লিখেছে, ঠিকই লিখেছে।
এসব দেখে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ইসবুকে লিখেছেন, “ট্রান্সকমের মালিকানাধীন প্রথম আলো যখন বসুন্ধরা নিয়ে প্রতিবেদন করে, তখন ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যেন চালুনি সুঁইকে বলছে, তোমার পেছনে এতো ফুটো কেন?”
“উলফা সংশ্লিষ্টতা, ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে নিবিড় যোগাযোগ, বিগত সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তির নির্দেশে মনের মাধুরী মিশিয়ে ন্যারেটিভ তৈরির অক্লান্ত প্রচেষ্টা এসব ভুলে গেলে তো সমস্যা?”
তিনি দুটি সংবাদপত্রের সমালোচনা করে বলেন, “বসুন্ধরা কোনও ধোয়া তুলসী পাতা নয়, তবে ট্রান্সকমের দুটি পত্রিকার কীর্তিকলাপের সামনে তাদের অপকর্ম নস্যিসম।”
এর মধ্যে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব ফেইসবুকে লিখেছেন, “দুই পত্রিকার মালিক/প্রকাশক পক্ষের পুরানা রেষারেষি নতুন করে শুরু হয়েছে। থলের কিছুবেড়াল বেরিয়ে আসুক।”
তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের মিডিয়া মালিক, প্রকাশক ও সম্পাদকদের আয়কর ফাইল, ভ্যাট, ভর্তুকি ও শুল্কছাড়ের ফাইল টানলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।
আরও খবর:



