হাদি হত্যা নিয়ে ভাই ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে ধূম্রজাল

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ওসমান হাদি ও তার ভাই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ওসমান হাদি ও তার ভাই।

প্রায় ছয় মাস পর ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং হাদির ভাই শরীফ ওমর হাদির বক্তব্য নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে পুলিশ ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে চিহ্নিত করার পর তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হয়ে এখন সেদেশের কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু এখন মমতা ও হাদির ভাইয়ের বক্তব্যের কারণে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কে কলকাঠি নাড়িয়েছেন?

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর সড়কে প্রকাশ্য গুলি করা হয়। এক সপ্তাহ পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

হাদি জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের কাছে জনপ্রিয় হলেও তার বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে বেশ সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে তার অশালীন স্লোগান নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলেছিলেন।

হাদি হত্যাকাণ্ড ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ঘটিয়েছেন বলে তদন্তের পর পুলিশ দাবি করে। তবে জানানো হয়, ফয়সাল হত্যাকাণ্ডের দিনই ভারতে পালিয়ে যান।

গত ৮ মার্চ ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স বা এসটিএফ।

তার প্রায় তিন মাস পর তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা এই নিয়ে মুখ খুললেন। তার এক মাস আগে তিনি নির্বাচনে হেরে মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারান। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা নিয়েছে বিজেপি, যারা কেন্দ্রেও ক্ষমতাসীন।

বিরোধী দলে নেমে গত ২ জুন কলকাতায় এক কর্মসূচিতে মমতা বলেন, “বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার সেই অধিকার নেই, কিন্তু আমার মুখ্য বক্তব্য হলো, তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তার পরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়, এটা দেশের স্বার্থে।’”

বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর উদ্দেশে মমতা বলেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও আমি তো সবটাই জানি।”

মমতা তার বক্তব্যে নাম উল্লেখ না করলেও তিনি যে হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলেছিলেন, তা স্পষ্ট। কারণ এসটিএফ ফয়সাল করিম ও আলমগীরকেই গ্রেপ্তার করেছিল।

এদিকে মমতার বক্তব্যের পরপরই হাদির ভাই শরীফ ওমর হাদি ফেইসবুকে এক পোস্টে লেখেন,

“শহিদ ওসমান হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামাতের একজন পিএস জড়িত। হাদিকে ঢাকা-০৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রেসার দিয়েছে আমাদের।”

তিনি আরো দাবি করেন, “শহিদ ওসমান হাদির খুনের সাথে ইন্টেরিম সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাদি হত্যার সাথে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করুন।”

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত ওমর হাদি পরে সেই পোস্ট সরিয়ে নিয়ে লেখেন, “শহিদ ওসমান হাদি হত্যা মামলা তদন্তাধীন থাকায় আমার পোস্ট প্রত্যাহার করে নিলাম। তবে হাদিকে হত্যার পূর্বে এবং পরে হাদির সাথে ঠিক কী ঘটেছিল, এই বিষয় নিরপেক্ষ আলোচনা এবং তদন্ত আবশ্যক।”

তবে মমতার বক্তব্য ও ওমর হাদির এই পোস্ট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে কোনো দলই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “পাশের দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে তিনি পরাজিত হয়েছেন, তিনি তাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছেন। সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।”

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, মমতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে তারা মনে করেন।

তিনি বলেন, “তার কথা থেকে বোঝা যায় যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং আধিপত্যবাদী চিন্তা থেকে এদেশের সরকারে ওঠা-নামার রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে বলে বলা হয় সেই খেলাতেই তারা মেতে উঠেছে।”

এদিকে জুলাই অভ্যূত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলছেন, মমতার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখনই এ বিষয়ে ভারত সরকারের ব্যাখ্যা চাওয়া।

এদিকে মমতা ও হাদির ভাইয়ের বক্তব্য থেকে বিভিন্নজন নানা সমীকরণ টানছেন। প্রবাসী কলামনিস্ট মারুফ মল্লিক ফেইসবুকে লিখেছেন,

“তাহলে মমতা ও হাদির ভাইয়ের বক্তব্য অনুসারে দাড়ায় বিজেপি+জাশি (জামায়াত-শিবির) = হাদি হত্যা।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিষয়টি দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এখন মমতার বক্তব্যের কোনো ভিত্তি আছে কি-না সেটি প্রমাণ ছাড়া বলা কঠিন। মমতা যা বলেছেন নির্বাচনে হারার পর বলেছেন। এর সূত্র ধরে এদেশেও কিছু লোক এ নিয়ে রাজনীতি করছে। তবে দেখতে হবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিক থেকে কোনো জবাব আসে কি না।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads