যুক্তরাজ্য থেকে জাপান, ফিনল্যান্ড থেকে সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশের সরকার নাগরিকদের ঘরে অন্তত তিন দিন থেকে এক সপ্তাহের খাবার, পানীয় জল ও জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তাহলে কি যুদ্ধের আশঙ্কা, সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বিশ্বকে নতুন এক খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
কয়েক দিন আগেও যে বিষয়টি যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন মানুষের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, সেটিই এখন বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
কোথাও বলা হচ্ছে অন্তত তিন দিনের খাবার রাখতে, কোথাও এক সপ্তাহের। আবার কোনো কোনো দেশে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো দেশে এ ধরনের প্রস্তুতির সরকারি নির্দেশনা বা পরামর্শ রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও সদস্যদেশগুলোকে জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার সক্ষমতা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার নতুন করে ‘বি রেডি’ (Be Ready) নামে একটি জাতীয় প্রচারাভিযান শুরু করে। এতে নাগরিকদের বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন ও ইন্টারনেটের মতো জরুরি পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে নিজেদের সামলাতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এরপর ২ নভেম্বর জাপানের নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করার সময় নাগরিকদের অন্তত তিন দিন এবং সম্ভব হলে এক সপ্তাহের খাবার, পানি ও জরুরি টয়লেট সামগ্রী সংরক্ষণের আহ্বান জানায়। জাপানে সরকারের এই ‘জরুরি আহ্বান’ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধ কিংবা বড় কোনো বিপর্যয় আসন্ন কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা ও জরুরি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরকারি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে একই সময়ে এমন প্রস্তুতির প্রয়োজন কেনই বা দেখা দিল- এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে। তাহলে কি সরকারগুলো কী কোনো বড় সংকটের আশঙ্কা করছে, নাকি পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের নাগরিকদের আরও স্বনির্ভর করে তুলতে চাইছে দেশগুলো?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, ফিনান্সিয়াল টাইমস, রয়টার্স, ইউরোপীয় কমিশন এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনা ঘেঁটে এর কারণ বোঝার চেষ্টা করেছে দ্য সান টোয়েন্টিফোর।
যুক্তরাজ্য: গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামে তিন বছর মেয়াদি একটি জাতীয় প্রচারাভিযান শুরু করে। এর উদ্দেশ্য, কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট কিংবা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে যেন সাধারণ মানুষ অন্তত কয়েক দিন নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটাতে পারেন।
সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবারের ঘরে অন্তত তিন দিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় জল থাকা উচিত। পাশাপাশি জরুরি ওষুধ, টর্চ, ব্যাটারি, চার্জার এবং কিছু নগদ অর্থ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রায় নয় লিটার পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য তিন দিনের হিসাবে প্রায় ৩৬ লিটার পানি প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাজ্যের সরকারের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঝড়, দাবদাহ, দাবানলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দৈনন্দিন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এসব পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া সাইবার হামলা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের ঝুঁকিও বিবেচনায় রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জার্ভিসের বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নিলে জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের অগ্রাধিকার দিতে পারবে।
তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এই নির্দেশনা কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস নয়। এটি সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ।
জাপান: এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি জাপানেও এখন খাদ্য ও পানি মজুতের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২ নভেম্বর ২০২৬ দেশটিতে নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (Disaster Management Agency) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। সংস্থাটির উদ্বোধনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কোশি হোসোনো নাগরিক, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানান।
এর আগে ২৬ অক্টোবর ফুজি টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি নাগরিকদের অন্তত তিন দিনের খাবার ও পানি এবং সম্ভব হলে এক সপ্তাহের জরুরি সামগ্রী ঘরে রাখার পরামর্শ দেন।
জাপানের নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নানকাই ট্রাফ এলাকায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে। এছাড়া টোকিও মহানগরীর নিচে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ।
একটি বড় ভূমিকম্প হলে সড়ক, যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দুর্গত এলাকায় খাবার ও পানীয় জল পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।
জাপানের সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকদের নিজেদের প্রস্তুত রাখা গেলে বড় দুর্যোগের সময় সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে।
তবে সরকারের ‘জরুরি আহ্বানের’ পর সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বযুদ্ধ কিংবা বড় কোনো সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই কি এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে?
জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা আসন্ন দুর্যোগের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই আহ্বান জানানো হয়নি। এটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ।
ফিনল্যান্ড: উত্তর ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডে খাদ্যনিরাপত্তা ও জরুরি প্রস্তুতির বিষয়টি বহু পুরোনো। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক নিরাপত্তা বাস্তবতার কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় জরুরি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
ফিনল্যান্ডের সরকারি অনলাইন সেবা Suomi.fi নাগরিকদের অন্তত তিন দিনের খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত পানীয় জল, সহজে খাওয়া বা রান্না করা যায় এমন খাবার, ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চ, পাওয়ার ব্যাংক, জরুরি ওষুধ, স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার সামগ্রী এবং কিছু নগদ অর্থ রাখা উচিত।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডের কৌশলগত শস্যভান্ডার সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া বা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে প্রায় নয় মাস পর্যন্ত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের সক্ষমতা রাখে।
ফিনল্যান্ডের প্রস্তুতির মূল কারণ তারা যেকোনো সংকটের সময় বাইরের সাহায্য আসার অপেক্ষায় না থেকে নাগরিক ও রাষ্ট্র যেন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারে।
এ কারণেই দেশটির জাতীয় জরুরি সরবরাহ সংস্থা (National Emergency Supply Agency) খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংস্থা, জ্বালানি খাত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফিনল্যান্ডে TIETO26 নামে বড় একটি প্রস্তুতিমূলক মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৮০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা অংশ নেয়।
দীর্ঘমেয়াদি সংকট, সাইবার হামলা, হাইব্রিড হুমকি এবং সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ কীভাবে সচল রাখা যায়, সেটিই ছিল মহড়ার অন্যতম লক্ষ্য।
সুইডেন: ফিনল্যান্ডের প্রতিবেশী সুইডেনও নাগরিকদের খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী মজুতের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
দেশটির নাগরিকদের জন্য প্রকাশিত ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ (If Crisis or War Comes) নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রতিটি পরিবারের অন্তত এক সপ্তাহ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি থাকা উচিত।
২০২৪ সালে সুইডেনের প্রায় ৫০ লাখ পরিবারের কাছে এই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল।
সুইডেনের নাগরিকদের দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার, শুকনো খাবার, ডাল, চাল, পাস্তা, টিনজাত মাছ ও মাংস, বাদাম এবং পানীয় জল রাখার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, এমন খাবার রাখতে হবে যা, বিদ্যুৎ বা গ্যাস না থাকলেও খাওয়া সম্ভব অথবা খুব অল্প জ্বালানিতে রান্না করা যায়।
দেশটির নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে পানীয় জল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে, টয়লেট ব্যবহার করা সম্ভব না হলে কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে হবে এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে কীভাবে খাবার সংরক্ষণ করতে হবে।
সুইডেনের খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে দেশটির সামরিক ও বেসামরিক প্রস্তুতি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও জোরদার হয়েছে।
জার্মানি: জার্মানিতে খাবার মজুতের নির্দেশনা নতুন নয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই দেশটির সরকার নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়ে আসছে।
১৯৬০-এর দশকে পশ্চিম জার্মানির পরিবারগুলোকে ১৪ দিনের খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই সুপারিশ কমিয়ে ১০ দিন করা হয়।
জার্মানির ফেডারেল অফিস অব সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড ডিজাস্টার অ্যাসিস্ট্যান্সের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সম্ভব হলে পরিবারের জন্য অন্তত ১০ দিনের প্রয়োজনীয় খাবার সংরক্ষণ করা উচিত। তবে তিন দিনের খাবার থাকলেও তা জরুরি পরিস্থিতিতে বড় সহায়তা হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির প্রায় অর্ধেক পরিবার তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার এই ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করতে পারেনি।
দেশটির নির্দেশিকায় এমন খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। পাশাপাশি অল্প সময়ে রান্না করা সম্ভব এমন খাবারও রাখতে বলা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির সংকট দেখা দিলে রান্নার জ্বালানি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়।
শুধু খাবার নয়, ব্যাটারিচালিত বা সৌরশক্তিচালিত রেডিও, জরুরি ওষুধ, প্রয়োজনীয় ফোন নম্বরের কাগজে লেখা তালিকা এবং অন্যান্য সামগ্রীও প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
নরওয়ে, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস: দেশ তিনটির নাগরিকদেরও জরুরি খাদ্য ও পানীয় জল সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নরওয়ের নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির নির্দেশনায় বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট ও ব্যাংকের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বিশেষ করে নরওয়ের অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎনির্ভর গরম করার ব্যবস্থা থাকায় শীতকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে খাবারের পাশাপাশি গরম পোশাক, কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ, মোমবাতি ও বিকল্প তাপের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ফ্রান্সে প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাবার, পানি, ওষুধ ও নগদ অর্থের পাশাপাশি জরুরি অবস্থায় দ্রুত বাড়ি ছাড়তে হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো তিন দিনের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সাল থেকে জরুরি প্রস্তুতি নিয়ে সরকারি প্রচারাভিযান চালু রয়েছে। দেশটির Ready.gov নির্দেশনায় পরিবারগুলোকে দুর্যোগের জন্য আগাম পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে।
প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩.৮ লিটার পানি সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পান করা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনে ব্যবহারের পানিও রয়েছে।
খাদ্যসংরক্ষণের সময় এমন পণ্য বেছে নিতে বলা হয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরা দুর্যোগের সময় এক জায়গায় নাও থাকতে পারেন—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাড়ি, কর্মস্থল ও গাড়িতে প্রয়োজনীয় জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ায় অধিকাংশ রাজ্য ও অঞ্চল তিন থেকে সাত দিনের জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটির নিউ সাউথ ওয়েলসের স্বাস্থ্য বিভাগ কিছু পরিস্থিতিতে দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি রাখার কথা বলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দাবানল, বন্যা, ঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি খাদ্য ও পানীয় জল সংরক্ষণের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারত: দেশটিতে দুর্যোগ প্রস্তুতি নির্দেশিকাতেও অন্তত তিন দিনের খাবার ও পানীয় জল সংরক্ষণের পরামর্শ রয়েছে।
দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের প্রস্তুতিমূলক তালিকায় বলা হয়েছে, বাড়ির আশপাশের সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি এমন খাবার সংরক্ষণ করতে হবে, যেগুলো রান্না বা ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন কম।
বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো এলাকায় খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যাতে পরিবারগুলো কয়েক দিন চলতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মহামারির সময় আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিভিন্ন সরকার আবারও কৌশলগত খাদ্য মজুতের দিকে ঝুঁকছে।
ফিনল্যান্ডের মতো দেশ দীর্ঘদিন ধরে শস্যের কৌশলগত মজুত ধরে রেখেছে। সুইডেন নতুন করে খাদ্য প্রস্তুতি ও শস্য মজুতের উদ্যোগ নিচ্ছে। নরওয়ে ও জার্মানিও জরুরি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করছে।
সুইডেন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য শস্য, বীজ ও সারসহ জরুরি কৃষি উপকরণ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাজে প্রায় ৫৭৫ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথাও ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশও খাদ্যভান্ডার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মিসর ও ব্রাজিলের মতো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ফসলের ক্ষতি, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সরকারি খাদ্য মজুতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চীনও খাদ্যশস্যের বড় মজুত ধরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
সরকারগুলোর যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই সংকটের আগেই পর্যাপ্ত মজুত থাকা প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিষয়টিকে শুধু খাদ্যসংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। ২০২৫ সালের মার্চে ইউরোপীয় কমিশন ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ (Preparedness Union Strategy) ঘোষণা করে।
এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, সামরিক সংঘাত, সাইবার হামলা ও অন্যান্য বড় সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের সামগ্রিক প্রস্তুতি বাড়ানো।
পরিকল্পনায় নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে জরুরি পণ্য মজুতের সমন্বয়, খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় কমিশন আরও একটি সমন্বিত স্টকপাইলিং কৌশল সামনে আনে। এর লক্ষ্য হলো সদস্যদেশগুলোর মধ্যে জরুরি পণ্য মজুতের তথ্য ও সক্ষমতা সমন্বয় করা, কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এতে খাদ্য, পানি, জ্বালানি, চিকিৎসাসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের মতো পণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপের প্রস্তুতি এখন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে খাবার মজুতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং একটি বড় সংকটের সময় পুরো মহাদেশের সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে সচল রাখা যায়, সেটিও পরিকল্পনার অংশ।
তাহলে কি বিশ্ব বড় কোনো সংকটের দিকে যাচ্ছে?
বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রস্তুতি, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—বিশ্ব এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে নাগরিকদের তিন দিন বা এক সপ্তাহের খাবার মজুত রাখার পরামর্শকে আসন্ন বিশ্বযুদ্ধ কিংবা নিশ্চিত খাদ্যসংকটের পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নেওয়া সঠিক হবে না।
বিভিন্ন দেশের সরকারও স্পষ্ট করেছে, তাদের নতুন আহ্বান কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা আসন্ন দুর্যোগের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়নি। যুক্তরাজ্যও তাদের ‘বি রেডি’ প্রচারাভিযানকে দৈনন্দিন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার মতো বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।




