একটি টি-শার্ট তৈরির পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম, হাতের ছোঁয়া। কাপড় কাটা, সেলাই, জোড়া লাগানো, ফিনিশিং—প্রতি ধাপেই প্রয়োজন হয় দক্ষ হাতের।
বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে এই বিপুল শ্রমশক্তিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই পরিচিত চিত্র কি বদলে যেতে চলেছে? তাহলে কি ভবিষ্যতে পোশাক কারখানায় মানুষের পরিবর্তে কাজ করবে রোবট?
প্রশ্নটি এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। বিশ্বের কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপ স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করছে। এমনকি মানুষের হাতের সূক্ষ্ম কাজ বলে পরিচিত সেলাইয়ের কাজও রোবটের মাধ্যমে করার প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই- কম শ্রমিক, কম উৎপাদন ব্যয় এবং দ্রুত উৎপাদন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে রোবটনির্ভর পোশাক উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তাদের উদ্যোগ সফল হলে শুধু পোশাক তৈরির পদ্ধতিই নয়, বদলে যেতে পারে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের উৎপাদনব্যবস্থাও।
সেলাই ছাড়াই তৈরি হবে টি-শার্ট?
পোশাক তৈরিতে রোবট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধা হলো কাপড়ের প্রকৃতি। ধাতু কিংবা শক্ত কোনো বস্তু রোবট সহজেই ধরতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু কাপড় নরম, নমনীয় এবং সহজেই ভাঁজ হয়ে যায়। ফলে কাপড়ের দুটি অংশ নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে সেলাই করা রোবটের জন্য বেশ কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটমি (CreateMe) এই সমস্যার ভিন্ন একটি সমাধান খুঁজেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত সেলাইয়ের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার করে পোশাক তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ক্যাম মায়ার্সের মতে, কাপড়ের দুটি অংশ সেলাই করার সময় সেগুলোকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখা রোবটের জন্য জটিল। এ সমস্যার সমাধানে কাপড়ের নির্দিষ্ট অংশে বিশেষ আঠা প্রয়োগ করে রোবটের সাহায্যে সেগুলো জোড়া লাগানোর পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে।
এ প্রযুক্তিতে কাপড়ের অংশগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে প্রচলিত সেলাই ছাড়াই পোশাকের বিভিন্ন অংশ যুক্ত করা সম্ভব।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রিয়েটমি ইতোমধ্যে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের অন্তর্বাস তৈরি করছে। এবার টি-শার্ট উৎপাদনেও প্রযুক্তিটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তাদের দাবি, ব্যবহৃত বিশেষ আঠা সাধারণ ইস্ত্রি কিংবা ওয়াশিং মেশিনের তাপমাত্রায়ও কার্যকর থাকে।
অর্থাৎ পোশাক তৈরির এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে, যেখানে মানুষের হাতের পরিবর্তে রোবটই কাপড়ের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারে পোশাক কারখানা
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব পোশাকশিল্পের বড় অংশের উৎপাদন এশিয়াকেন্দ্রিক। তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়, দক্ষ শ্রমিক এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অগ্রগতি এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার করা গেলে পশ্চিমা দেশগুলোতে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে যেসব উৎপাদনব্যবস্থা একসময় কম শ্রমব্যয়ের কারণে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছিল, সেগুলোর কিছু অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ফিরে আসতে পারে।
ক্রিয়েটমির প্রধান নির্বাহী ক্যাম মায়ার্স জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক বাজারজাত করতে আগ্রহী বিভিন্ন ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ব্যবহার করে দেশটির ভেতরেই পোশাক তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
মায়ার্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের টি-শার্ট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশও যদি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে তা পোশাকশিল্পে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রোবটের হাতে সেলাইয়ের দায়িত্ব
সব প্রতিষ্ঠান অবশ্য সেলাইয়ের পরিবর্তে আঠা ব্যবহারের পক্ষে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার অটোমেশন (Softwear Automation) প্রচলিত সেলাইপ্রক্রিয়াকেই রোবটের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পালানিস্বামী রাজনের মতে, পোশাকের দৃশ্যমান সেলাই অনেক সময় নকশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে জিনসের মতো পোশাকে সেলাইয়ের নিজস্ব নান্দনিক ও ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই সেলাই প্রযুক্তি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
প্রতিষ্ঠানটি সেলাইয়ের জন্য রোবটের তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। রাজনের দাবি, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি টি-শার্টের উৎপাদন খরচ আমদানি করা টি-শার্টের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে জার্মানির রোবোটেক্সটাইল (Robotextile) কাপড় ধরার সমস্যা সমাধানে বিশেষ ধরনের গ্রিপার তৈরি করছে। বাতাসের প্রবাহ ব্যবহার করে কাপড়কে কিছুটা ওপরে তুলে ধরে রাখার প্রযুক্তিও তৈরি করা হয়েছে। এতে রোবটের পক্ষে কাপড়ের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
তবে প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ফ্রায়েড মনে করেন, ইউরোপে পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হতে আরও সময় লাগবে। তার ধারণা, ইউরোপে পোশাক উৎপাদন ফিরিয়ে আনার বাস্তব উদ্যোগ দেখতে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
পোশাকশিল্পের পরিবেশগত ক্ষতি কমবে?
পোশাকশিল্পে রোবট ব্যবহারের আলোচনা শুধু উৎপাদন খরচ কিংবা শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টিও।
বিশ্বে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্রবর্জ্য তৈরি হয়। অবিক্রীত পোশাকের একটি অংশ ধ্বংস করা হয়। পোশাক উৎপাদনে প্রচুর পানি ব্যবহার হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।
অস্ট্রিয়ার টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব লিওবেনের গবেষক জেরাল্ড ফাইখটিঙ্গার পোশাক উৎপাদনে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং স্থানীয় উৎপাদনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তার গবেষণায় তুলার টি-শার্ট উৎপাদনের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল The International Journal of Life Cycle Assessment সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, প্রচলিত আধা-স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থায় একটি টি-শার্ট তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রায় ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ১ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য।
অন্যদিকে পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, অতিরিক্ত উৎপাদন কমানো এবং বাজারের কাছাকাছি কারখানা স্থাপনের সমন্বিত পরিস্থিতিতে এ পরিমাণ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৮ কেজিতে নেমে আসতে পারে।
গবেষণায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য মোট ১৫টি উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
যার অর্থ দাঁড়ায়, উৎপাদনপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি বাজারের কাছাকাছি কারখানা স্থাপন এবং চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করা গেলে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দ্রুত সরবরাহের জন্য আকাশপথে পণ্য পরিবহন করলে পরিবেশগত সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ?
রোবটনির্ভর পোশাক উৎপাদনের সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়বে শ্রমিকনির্ভর কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশের অর্থনীতি পোশাকশিল্পের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই রোবটনির্ভর পোশাক খাত রীতিমত হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, যা মোট জিডিপির ১০ শতাংমের অংশীদার। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে সরাসরিভাবে জড়িত।
কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো যদি রোবটের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে পোশাক তৈরি করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সাধারণ টি-শার্টের মতো পণ্যের উৎপাদন স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হলে এশিয়ার শ্রমনির্ভর কারখানাগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে কোভিড-১৯ মহামারির সময় কারখানা বন্ধ হওয়া এবং ইরান যুদ্ধের কারণে পলিয়েস্টার সরবরাহে প্রভাব পড়ার মতো ঘটনাগুলোর কথাও উঠে এসেছে। এসব পরিস্থিতি পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, নাকি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, রোবটের ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কিছু কাজ মানুষের হাত থেকে যন্ত্রের হাতে চলে যাবে। তবে একই সঙ্গে রোবট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো নতুন দক্ষতাভিত্তিক কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্সটাইল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক ব্যবস্থাপক লরেন জুনেস্ট্র্যান্ডের মতে, যুক্তরাজ্যের পোশাকশিল্পে রোবট ব্যবহারের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উৎপাদনের পরিমাণের দিক থেকে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে। তার মতে, মানুষের শ্রম ও রোবটের প্রযুক্তি পাশাপাশি ব্যবহারের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের পোশাক কারখানায় মানুষ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে, এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বরং কোন কাজ মানুষ করবে আর কোন কাজ রোবটের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে, সেই সীমারেখা বদলে যেতে পারে।



