বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার দাবি কি সত্যি হচ্ছে?

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণসহ বিপুলসংখ্যক মামলা দায়ের হয়। পরবর্তী সময়ে এসব মামলার কয়েকটির তদন্তে এমন সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যেখানে এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে বাস্তব তথ্যের গুরুতর অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কোথাও যাকে হত্যা করা হয়েছে বলা হয়েছিল, তদন্তে তাকে জীবিত পাওয়া গেছে; কোথাও কথিত নিহত ব্যক্তিরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; কোথাও গুলিতে নিহতের অভিযোগ থাকলেও ময়নাতদন্তে শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি; আবার নয়টি গুলিতে আহত হওয়ার দাবির পক্ষে দেওয়া চিকিৎসার কাগজপত্রকে তদন্তকারী কর্মকর্তাই ভুয়া বলে চিহ্নিত করেছেন।

কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শেষে সরাসরি মামলাকে ‘মিথ্যা’ বা ‘সাজানো’ বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছে। আবার কিছু মামলায় ঘটনা সত্য হলেও ঘটনাস্থল, বাদীর পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

মামলায় গুলি লাগার দাবি, তদন্তে আহত হওয়ারই প্রমাণ নেই

সর্বশেষ এমন একটি ঘটনা সামনে আসে মোহাম্মদপুর থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে। নূর হোসেন নামে এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনের সময় তার শরীরে নয়টি গুলি লাগে। এর মধ্যে পিঠে ছয়টি, বাঁ হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান হাঁটুর পাশে একটি।

বিজ্ঞাপন

এ অভিযোগে তিনি ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলাও করেন।

কিন্তু তদন্তে তার আহত হওয়ার দাবির সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নামে মামলার সঙ্গে দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র হাসপাতালটির নয়।

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, কাগজপত্রে ব্যবহৃত একটি ক্যাশ মেমো নম্বর প্রকৃতপক্ষে ৫৪ বছর বয়সী অন্য এক রোগীর এবং ব্যবহৃত আইডি নম্বরটি ৩২ বছর বয়সী আরেক রোগীর। সরকারি জুলাই আহতদের গেজেটেও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।

এমন অবস্থায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উক্যমং রাখাইন ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় মামলার অভিযোগ ‘প্রাথমিকভাবে মিথ্যা’ প্রমাণিত হয়েছে।

স্ত্রীকে হত্যার মামলায় ‘স্ত্রী বা মৃত্যুরই’ হদিস নেই

সুমন নামের এক ব্যক্তি ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মামলা করে দাবি করেন, তার স্ত্রী ফাতেমা ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরে আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত হন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে আসামি করা হয়।

যদিও তদন্তে পুলিশ কথিত হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে হাসপাতালের নথি, মৃত্যু সনদ কিংবা দাফনের প্রমাণ পায়নি। যে কবরস্থানে ফাতেমাকে দাফন করার কথা বলা হয়েছিল, সেখানেও এমন দাফনের তথ্য মেলেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাদী নিজেই পুলিশকে জানান যে তিনি ফাতেমা নামে ওই নারীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না এবং এমন কোনো মৃত্যুর বিষয়েও জানতেন না।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক প্রলোভন ও কিছু ব্যক্তির চাপে তিনি মামলা করেছিলেন। পরে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সরে আসার চেষ্টা করেছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে পুরো ঘটনাকে সাজানো হিসেবে উল্লেখ করেন এবং শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

মৃত শিশু আদালতে এসে জানাল সে জীবিত

কেরানীগঞ্জের শিশু জিহাদের ঘটনা ভুয়া বা তথ্যগতভাবে অসত্য মামলার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

জহিরুল ইসলাম রাজু অভিযোগ করেছিলেন, তার ১১ বছর বয়সী ছেলে জিহাদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ৩ সেপ্টেম্বর মারা যায়। শেখ হাসিনাসহ ১২৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। তবে তদন্তে বেরিয়ে আসে, জিহাদ মারা যায়নি।

সে গুলিতে আহত হয়েছিল এবং পরে নিজেই আদালতে জবানবন্দি দিয়ে জীবিত থাকার পাশাপাশি আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

তদন্তে আরও দেখা যায়, অভিযোগে ঘটনাস্থল কেরানীগঞ্জ বলা হলেও প্রকৃত ঘটনাস্থল ছিল ঢাকার হাজারীবাগ থানার আওতাধীন এলাকা। অভিযোগের সমর্থনে যে মৃত্যু সনদের কথা বলা হয়েছিল, সেটিরও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, পুনর্বাসনের ঘর ও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার আশায় জিহাদের বাবাকে প্রভাবিত করা হয়েছিল এবং একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আহত জিহাদকে ‘নিহত’ হিসেবে মামলায় উপস্থাপন করে।

২০২৫ সালের ১১ আগস্ট পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ করে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের অব্যাহতি দেয়।

গুলিতে নিহত, শরীরে নেই আঘাতের চিহ্ন

বগুড়ার রিপন ফকিরের ঘটনাটিও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা একের পর এক মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৪ আগস্ট বগুড়ার ঝাউতলা এলাকায় আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিয়ে রিপন ফকির গুলিতে নিহত হন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তিকে সরাসরি আসামি করা হয় এবং সব মিলিয়ে কয়েকশ ব্যক্তির নাম আসে।

কিন্তু মামলার পর রিপনের স্ত্রী ও ভাই সাংবাদিকদের জানান, রিপন গুলিতে মারা যাননি। তাদের বক্তব্য ছিল, খাবার খাওয়ার সময় রুটি গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সরকারি সহায়তা ও ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতির আশ্বাস দিয়ে দুই ব্যক্তি তাদের কিছু কাগজে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন।

আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১১২ দিন পর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর রিপনের মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ২০২৫ সালের ২০ মার্চের প্রতিবেদনে তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২২ জন সাক্ষীর বক্তব্যসহ তদন্তের পর পুলিশ শেখ হাসিনাসহ ১০৪ আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

‘নিহত’ বাবু জীবিত, সৌদি আরবে কর্মরত

ঢাকার হাতিরঝিল থানার আরেক মামলায় দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উলন রোডে পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী মো. বাবু নিহত হন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়।

তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে চাঁদপুরে যায়। সেখানে বেরিয়ে আসে, কথিত নিহত ব্যক্তি মারা যাননি। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি জীবিত অবস্থায় সৌদি আরবে কর্মরত। শাকিল নিজেও সংবাদমাধ্যমকে জীবিত থাকার কথা নিশ্চিত করেন।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্টে শিক্ষার্থীদের উদযাপন।

এখানেই শেষ নয়। মামলার কথিত বাদী মো. ইসমাইলের পরিচয় নিয়েও অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এজাহারে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে অন্য ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। পরে প্রকৃত ইসমাইলকে শনাক্ত করা হলে তিনি আদালতে জানান, তিনি ওই মামলা করেননি; তার পরিচয় অন্য কেউ ব্যবহার করেছে।

তদন্তে সংযুক্ত মৃত্যু সনদটিও জাল বলে পাওয়া যায়। সরকারি জুলাই শহীদের তালিকা, ঘটনাস্থল, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ও সাক্ষ্য যাচাই করেও বাবু নামে কারও মৃত্যুর প্রমাণ মেলেনি।

তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ ঘোষণা করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

নিহত ব্যক্তির অস্তিত্ব পায়নি পিবিআই

পল্টনের আরেকটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বক্স কালভার্ট রোডে ২৪ বছর বয়সী পারভেজ আলী গুলিতে নিহত হন। মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তে পিবিআই এমন কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি, যার মাধ্যমে কথিত নিহত পারভেজ আলীর অস্তিত্বই নিশ্চিত করা যায়।

তদন্তে অভিযুক্ত কয়েকজনের মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও পরীক্ষা করা হয় এবং অভিযোগে উল্লেখ করা সময়ে তাদের ঘটনাস্থলে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে আসে।

নিহত ও বাদী কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি

আদাবর থানার একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আলী মিয়া নামে একজনকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গুলি করে হত্যা করেন। বাদী হিসেবে নাম দেওয়া হয় মো. তোহা খানকে।

তদন্তে পুলিশ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পায়নি। কথিত নিহত ব্যক্তির পরিচয় ও ঠিকানা অসম্পূর্ণ ও অসংগতিপূর্ণ পাওয়া যায়। একইভাবে বাদীকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার দেওয়া মোবাইল নম্বর কার্যকর ছিল না এবং ঠিকানায় গিয়েও ওই নামে কাউকে পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি ‘সত্য নয়’ উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।

একই মৃত্যুতে ভিন্ন জায়গায় মামলা

সব অসংগতি অবশ্য ‘কোনো হত্যাই ঘটেনি’ এমন নয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যক্তি সত্যিই নিহত হয়েছেন, কিন্তু সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরে দায়ের করা পৃথক মামলায় ঘটনাস্থল ও আসামিদের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে গুরুতর অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীর, জাকির হোসেন ও রমজান মিয়া জীবন— এই তিনজনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাটারা থানায় দায়ের হওয়া তিন মামলায় তদন্তকারীরা শেখ হাসিনাসহ মোট ৪৯৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

তদন্তে দেখা যায়, নিহতদের পরিবার যে মামলা বা অভিযোগ করেছিল, সেখানে ঘটনার স্থান এক রকম; অন্য ব্যক্তিদের করা পরবর্তী মামলায় একই মৃত্যুকে ভাটারা এলাকার ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

জাকির হোসেনের মায়ের করা মামলায় ঘটনাস্থল ছিল কদমতলীর দক্ষিণ দনিয়া এলাকা। কিন্তু পৃথক আরেক মামলায় তার মৃত্যু ভাটারায় হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

জাহাঙ্গীরের ক্ষেত্রেও তদন্ত কর্মকর্তা প্রকৃত ঘটনা সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ঘটেছে বলে তথ্য পান। এসব তথ্যগত অসঙ্গতি এবং নির্দিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে প্রমাণের অভাবে তদন্তকারীরা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

পরিবারের বাইরে অন্য ব্যক্তির পৃথক মামলা

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ওবায়দুল হকের মৃত্যুকে ঘিরেও এমন অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া যায়।

ওবায়দুল ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হন বলে পরিবারের বক্তব্য। কিন্তু মো. আলী নামের অন্য এক ব্যক্তি পৃথক মামলা করে দাবি করেন, ওবায়দুল এক দিন আগে অর্থাৎ ৪ আগস্ট মারা গেছেন। সেই মামলায় শেখ হাসিনাসহ প্রায় ২০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

ওবায়দুলের স্ত্রী মরিয়ম পরে নিজে স্বামীর হত্যার ঘটনায় মামলা করেন এবং অভিযোগ করেন, আলী তাদের পরিবারের কেউ নন এবং অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে ভুয়া মামলা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ মামলায় দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি মামলাটি করার কথাই অস্বীকার করেন।

পিবিআইয়ের তদন্তেও একাধিক ভুয়া মামলা

এ ধরনের অসঙ্গতি যে কেবল শেখ হাসিনাকে আসামি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা কিন্তু নয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত আদালতে দায়ের হওয়া ১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে তদন্ত করা মামলাগুলোর অন্তত ১৪টিকে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করেছে তারা। আরও ১০টি মামলার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

একটি ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ করা হলেও পিবিআই দেখতে পায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। আরেক হত্যা মামলায় যাকে মৃত দেখানো হয়েছিল, তাকে জীবিত পাওয়া যায়।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত সম্পন্ন হওয়া ১১৩ মামলার মধ্যে ৮৯টিতে কোনো না কোনো অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এসব মামলায় মোট ৬ হাজার ৮৪৪ জনকে আসামি করা হলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে ১ হাজার ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে।

শেখ হাসিনা ও তার দল কী বলছে

ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিপুলসংখ্যক মামলা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল আওয়ামী লীগ। দলটির বক্তব্য ছিল, সরকার পতনের পর হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা নিজেও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা নিজেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।

চলতি বছর এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বিচারব্যবস্থা নিয়ে বলেন, কোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা থাকলে সেটির বিচার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় হতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রয়টার্সকে দেওয়া লিখিত সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রহসন হিসেবে বর্ণনা করেন।

তার দাবি ছিল, বিচার এমন একটি আদালতে চলছে যেখানে দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত এবং তাকে যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এর আগে ২০২৫ সালে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা জুলাই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তিনি ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাঙ্গারো কোর্ট বলে অভিহিত করেন।

তিনি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের দায় নিজের ওপর আরোপের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন ওই সাক্ষাৎকারে।

গণমামলা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্ন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ৯২ হাজার ৪৮৬ জনকে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছিল, যার অধিকাংশই হত্যা-সংশ্লিষ্ট মামলা।

সংস্থাটি জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত আটটি এআইআর পর্যালোচনা করে। সেখানে একেকটি মামলায় সর্বোচ্চ ২৯৭ জন পর্যন্ত নামীয় আসামি এবং আরও কয়েকশ অজ্ঞাত আসামি ছিল।

এইচআরডব্লিউকে সাক্ষাৎকার দেওয়া পাঁচজন বাদী জানান, মামলা করার সময় তারা জানতেন না কাদের আসামি করা হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বা পুলিশ তাদের কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেছিল বলে তাদের বক্তব্য।

কয়েকজনকে এমন ধারণাও দেওয়া হয়েছিল যে নিহত স্বজনকে আন্দোলনের শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন পেতে মামলা করা প্রয়োজন।

এই মানবাধিকার সংগঠনটি এ ধরনের গণমামলা ও অজ্ঞাতনামা আসামির ব্যবহারকে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ১৮ মাসের মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও অসংগতির চিত্র সামনে এসেছে।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ৬৬৩টি মামলা এবং এর মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা ছিল। একই প্রতিবেদনে জুলাই আন্দোলনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় নির্বিচারে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি ও হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা ও গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বিচারে মামলা এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধভিত্তিক অভিযোগ দিতে ব্যর্থতা অনেক মামলার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে বলেই টিআইবি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

মামলা ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগও স্বীকার করেছিলেন সেসময়ের ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশ্যে বলেন, ৫ আগস্টের পর করা কিছু মামলার বাদী আসামিদের ফোন করে অর্থ দাবি করছেন এবং টাকা দিলে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

তিনি একে একধরনের চাঁদাবাজি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং কিছু পুলিশ সদস্যও এতে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা বলেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ

ads
বিজ্ঞাপন