সব ঠিকঠাক এগোলে শিগগিরই দেখা মিলতে পারে ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন মোড়। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই রীতিমতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নতুন সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দিয়েছেন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট সবচেয়ে বড় জোট হিসেবে আবির্ভূত হলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটও এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
তবে নির্বাচনের পর পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পরামর্শ সভায় আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতা সমর্থন জানান। নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন দেন ৪৬ জন। বাকি সাতজন কোনো প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ করেননি। আর এই সমীকরণে আইজেনকোট সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পেয়েছেন।
রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আলজাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, ল্য মন্ড এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েল ও দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইজেনকোটের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে একটি কার্যকর সরকার গঠন করা।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ ২৭টি আসন পেয়েছে। তবে তার নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী জোটের মোট আসন দাঁড়িয়েছে ৫৩।
অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি এককভাবে ২১টি আসন পেয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের জোটের মোট আসন ৪৮।
নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ফলাফল এসেছে আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। দেশটির আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দুটি রাজনৈতিক জোট সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। ইসরায়েলের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
তবে যেহেতু কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, সেক্ষেত্রে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের ৭ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সর্বোচ্চ আসন পেলেও তার বৃহত্তর জোট ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আট আসন পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকোটের জোটের ঘাটতি ১৩ আসন।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ফলাফল কার্যত ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
কেন আইজেনকোটকে বেছে নিলেন প্রেসিডেন্ট?
নির্বাচনের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেন। ৫ নভেম্বরের পরামর্শ সভায় আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতা এবং নেতানিয়াহুর পক্ষে ৪৬ জন সমর্থন জানান।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সাতজন সদস্য কোনো প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ করেননি।
প্রথমে হারজগ জানিয়েছিলেন, শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ এবং জোট গঠনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানও বিবেচনা করতে হবে।
তবে পরবর্তী আলোচনা শেষে ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ঘোষণা করেন, আইজেনকোটকেই সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দেওয়া হবে।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় জেরুজালেমে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীকে মনোনীত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব তাঁর।
দ্য জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, নির্বাচিত প্রার্থী প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন সরকার গঠনের জন্য। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। অর্থাৎ আইজেনকোটের হাতে সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় থাকতে পারে।
কে এই গাদি আইজেনকোট?
গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন মুখ হলেও দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া আইজেনকোট ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক প্রধান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক বাহিনীতে কর্মজীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। লেবানন যুদ্ধসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
২০২২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে বেনি গান্টজের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় আট মাস পর তিনি বিরোধী রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি ইয়াশার (Yashar) পার্টির নেতৃত্ব দিয়ে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে একজন অভিজ্ঞ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে বিরোধীদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও সাম্প্রতিক ইসরায়েলি যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গাজায় যুদ্ধের সময় তাঁর এক ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন।
দ্য ল্য মন্ডের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আইজেনকোটকে একজন মধ্যপন্থি রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
তবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাঁকে নেতানিয়াহুর বিপরীত মেরুর রাজনীতিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইসরায়েলের নিরাপত্তা, হামাস এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানও যথেষ্ট কঠোর।
আরব দলগুলোর সমর্থন, কিন্তু সরকারে জায়গা পাবে কি?
আইজেনকোটের সরকার গঠনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে ঘিরে।
নির্বাচনে আরব-নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট মোট ১৯টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্টের আসন ১১ এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমের আসন আট।
দুই দলই নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে আইজেনকোটকে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দেওয়ার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে।
৫ নভেম্বর আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, জয়েন্ট লিস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকোটের পক্ষে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত জানায়। এর আগে রা’আমও একই অবস্থান নেয়। এতে আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত হয়।
আইজেনকোট নির্বাচনী প্রচারণায় আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
অন্যদিকে আরব দলগুলোও তাদের সমর্থনের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার, বৈষম্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক নিশ্চয়তা চেয়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সমর্থন মানেই আইজেনকোটের সব রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। তাদের মূল লক্ষ্য নেতানিয়াহুর সরকারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো।
আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমাদ তিবি বলেছেন, তারা নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে আইজেনকোটের সঙ্গে তাদের নীতিগত মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাসও নেতানিয়াহু সরকারের পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর মিত্ররাও এবার দূরে সরে যাচ্ছে?
আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ পাওয়ার পেছনে আরব দলগুলোর সমর্থনের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম।
এটি ইসরায়েলের অতি-ধর্মীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি রাজনৈতিক দল। দলটির পার্লামেন্টে সাতটি আসন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর জোটের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরামর্শ সভায় তারা নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কারও পক্ষেই সুপারিশ করেনি।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি-ধর্মীয় তরুণদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে নেতানিয়াহুর জোটের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু অতি-ধর্মীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ধর্মীয় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চায়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিতর্ক চলছে।
নেতানিয়াহুর সরকার এই ইস্যুতে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিরোধী নেতা আভিগদর লিবারম্যানও নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগে তিনি অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করলেও এবার নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর স্বার্থে তাদের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। এই পরিবর্তন আইজেনকোটের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সরকার গঠনে আইজেনকোটের সামনে তিনটি বড় পথ
রয়টার্স, এপি, আলজাজিরা এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে আইজেনকোটের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ উঠে এসেছে।
আইজেনকোটের সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাবনা হলো আরব দলগুলোকে সরাসরি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না করে তাদের বাইরের সমর্থনে সরকার গঠন। এক্ষেত্রে তাঁর চারদলীয় জোটের ৪৮টি আসনের পাশাপাশি আরব দলগুলোর ১৯ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন কাজে লাগতে পারে।
এ ধরনের সরকারকে সংখ্যালঘু সরকার বলা হয়। অর্থাৎ সরকারে অংশ নেওয়া দলগুলোর আসনসংখ্যা ৬১-এর কম হলেও পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব।
তবে এই পথে তাঁর রাজনৈতিক মিত্রদের আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থি অবস্থানের কিছু নেতা আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকারকে সমর্থন করতে চান না।
আইজেনকোটের সামনে আরেকটি সম্ভাবনা হলো ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম এবং শাস (Shas) পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করা।
আলজাজিরার হিসাব অনুযায়ী, এই দুই দলের সাত ও ছয়টি আসন একত্রে আইজেনকোটের ৪৮ আসনের জোটের সঙ্গে যুক্ত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পূরণ হতে পারে। কিন্তু এখানে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের প্রশ্নে বড় মতপার্থক্য রয়েছে।
আইজেনকোট নির্বাচনী প্রচারণায় সব নাগরিকের জন্য সামরিক, জাতীয় বা বেসামরিক সেবার বাধ্যবাধকতার কথা বলেছেন। অন্যদিকে অতি-ধর্মীয় দলগুলোর অবস্থান এর বিপরীত। আর এ কারণে এই সমঝোতা বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
তৃতীয় সম্ভাবনাটি হলো নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।
এক্ষেত্রে দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি কিংবা প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ ভাগ করে নেওয়ার মতো সমঝোতা হতে পারে।
তবে আইজেনকোট এবং তাঁর বিরোধী জোটের একাধিক নেতা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন।
তাদের মূল দাবি হলো, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
আইজেনকোটের চার শর্তে কী রয়েছে?
সরকার গঠনের আলোচনায় আইজেনকোট নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত সামনে এনেছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেট নিউজের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদন এবং দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদনে তাঁর চারটি মূল নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, ইসরায়েলকে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত মৌলিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার থাকতে হবে। তৃতীয়ত, সব নাগরিকের জন্য সামরিক, জাতীয় অথবা বেসামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং গাজায় তাদের সামরিক ও শাসনক্ষমতা বিলুপ্ত করার বিষয়ে অঙ্গীকার থাকতে হবে।
এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় আইজেনকোট রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন এবং বিতর্কিত বিচার বিভাগীয় সংস্কারসংক্রান্ত আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগীয় সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েও ইসরায়েলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে।
এই সংস্কার পরিকল্পনা বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বিরোধীদের কাছে বিবেচিত হয়েছে।
নেতানিয়াহুর জন্য কেন এত বড় রাজনৈতিক ধাক্কা?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মেয়াদে তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় দেশটির সরকার পরিচালনা করেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল ডানপন্থি, ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোট।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং সরকারের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এরপর গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জিম্মিদের মুক্তি, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ তাঁর সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান ও ল্য মন্ডের নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থি অবস্থানের প্রভাব এখনো শক্তিশালী। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা কমে যাওয়ায় বিরোধীদের সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলেও তাঁর দল এখনো পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় একক দল। ফলে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছেন বলে মনে করার সুযোগ নেই। আইজেনকোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর সামনে আবারও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন হবে?
আইজেনকোট যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ইসরায়েলের মৌলিক আইন অনুযায়ী, প্রথম মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজন আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের অন্তত ৬১ জন সদস্য একত্রে অন্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারেন। সেই প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নেসেট ভেঙে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হবে।
ততদিন পর্যন্ত বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের সুযোগ এলেও নেতানিয়াহু সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারাচ্ছেন না।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইজেনকোটের সামনে তিনটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ থাকলেও প্রতিটির ক্ষেত্রে কঠিন সমঝোতার প্রয়োজন হবে। ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আরব ভোটের নতুন গুরুত্ব
এই নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। কিন্তু ইসরায়েলের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকারে মানসুর আব্বাসের রা’আম পার্টি যুক্ত হয়েছিল। ইসরায়েলের ইতিহাসে আরব-নেতৃত্বাধীন কোনো দল হিসেবে সরকারে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্মিলিত ১৯টি আসন নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে তাদের সমর্থন পাওয়া এবং সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা এক বিষয় নয়।
আইজেনকোটের জোটের ভেতরেও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব নিয়ে আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে আরব দলগুলোও শুধু নেতানিয়াহুকে সরানোর পরিবর্তে নিজেদের জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে রাজনৈতিক নিশ্চয়তা চাইছে।
এ কারণে এবারের সরকার গঠনের আলোচনা শুধু দুই নেতার ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সামনে কী?
ইসরায়েলের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আইজেনকোট কি নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অক্ষুণ্ন রেখে একটি কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবেন?
তাঁর সামনে একদিকে রয়েছে আরব দলগুলোর সমর্থন, অন্যদিকে অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা। আবার জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রস্তাবও পুরোপুরি আলোচনার বাইরে নয়। তবে যে পথই তিনি বেছে নিন, রাজনৈতিক আপসের প্রয়োজন হবে।
নেতানিয়াহুর জন্যও সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় একক দলের নেতৃত্ব এবং ডানপন্থি রাজনৈতিক সমর্থন এখনো তাঁর হাতে রয়েছে।
তবে এবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো এবং আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য বড় ধাক্কা।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের সামনে এখন দুটি সম্ভাবনা—নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সরকার গঠন, অথবা দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর আবারও নির্বাচনে যাওয়া।
আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ এসেছে। কিন্তু সেই সুযোগকে ক্ষমতায় রূপান্তর করতে হলে তাঁকে শুধু নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করলেই চলবে না; নিজের জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও সামাল দিতে হবে।
তবে যেটিই হোক, ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটবে কি না, তার উত্তর এখন নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক আলোচনার ওপর।



