যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে দলটি।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের বড় ধরনের প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৪ নভেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের জয় কেবল কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত রাজ্যেও দলটি বড় সাফল্য পেয়েছে। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য যে আমূল বদলে যেতে যাচ্ছে তা এখনই বলে দেওয়া যায়।
দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা
যুক্তরাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা মূলত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। এর একটি হলো ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। অন্যটি ১০০ সদস্যের সিনেট। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে ভোট হয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ২১৮–২১৪। সিনেটে দলটির আসন ছিল ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। এ কারণে উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ফলাফল হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) নির্বাচনী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে অন্তত সাতটি আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে এবং প্রতিনিধি পরিষদেও দুই ডজনের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। নির্বাচনের আগে যেসব আসন রিপাবলিকানদের নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছিল, সেগুলোর বেশ কয়েকটিতেও পরাজিত হয়েছেন দলটির প্রার্থীরা।
দ্য গার্ডিয়ানের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত নির্বাচনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রিপাবলিকানরা সিনেটে সাতটি আসন, প্রতিনিধি পরিষদের অন্তত ২৫টি আসন এবং পাঁচটি গভর্নর পদ হারিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল রিপাবলিকান পার্টি, তা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বড় ধাক্কা খেল।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও প্রেসিডেন্ট পদে থাকছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পই। ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য কার্যকর হবে।
কেন এত বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প?
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
অবশ্য ক্ষমতায় ফেরার দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগ দূর হয়নি। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি এবং দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী জরিপে দেখা যায়, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। তাঁদের ভাষায়, অর্থনীতি হয় ‘খুব একটা ভালো নয়’ অথবা ‘খারাপ’। একই জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মূল্যস্ফীতি তাঁদের পরিবারে মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে রয়টার্সের প্রকাশিত এক্সিট পোলের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে তাঁদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারের বড় অংশজুড়েই ছিল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি। যদিও ভোটারদের কাছে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ সরাসরি রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোটের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামে চাপ তৈরি হয়। যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়েও পড়ে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। কারণ, তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম ভিত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করা এবং জ্বালানির দাম কমানো।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তবে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য ইরানের পরিস্থিতিই দায়ী।
এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। ৪ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের ২০২৪ সালের অনেক সমর্থক অসন্তুষ্ট হয়ে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
ভ্যান্সের ওই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট, যুদ্ধের প্রভাব শুধু বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রিপাবলিকানদের নিজস্ব ভোটারদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোটার জরিপে দেখা যায়, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার দেশের বর্তমান গতিপথ নিয়ে ক্ষুব্ধ অথবা অসন্তুষ্ট। প্রায় অর্ধেক ভোটার কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারি দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একই জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।
এই পরিসংখ্যানের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা শুধু স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন না; তাঁরা প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডেরও মূল্যায়ন করেন।
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভোটারদের একটি বড় অংশ কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। এক্সিট পোল অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চান কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরও কার্যকর নজরদারি করুক।
নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন পাওয়া একাধিক রিপাবলিকান প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এতে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রার্থী নির্বাচনের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। প্যাক্সটন ছিলেন ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া প্রার্থী। রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরেও তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে আপত্তি ছিল। দলের কিছু নেতা আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁর বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থান সাধারণ নির্বাচনে দলের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সাউথ ক্যারোলাইনাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের আধিপত্য রয়েছে। চলতি শতাব্দীতে সেখানে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট নির্বাচনে জয় ছিল না।
কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। প্রায় ৯৪ বছর পর রাজ্যটি একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত করেছে।
এ ছাড়া ওহাইওতে শেরড ব্রাউন, নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার এবং মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদের জয় ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যকে আরও বিস্তৃত করেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীদের পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রার্থীর সামগ্রিক নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল কতটা কার্যকর, তা নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরে আলোচনা বাড়তে পারে।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে ছিল ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের অপ্রত্যাশিত সাফল্য।
এক্ষেত্রে টেক্সাসের কথা বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের আধিপত্য রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প টেক্সাসে প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন।
একই রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। তিনি টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন।
কানসাসের ঘটনাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় এক শতাব্দী ধরে রাজ্যটির সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ছিল না। এবার সেই ধারার অবসান ঘটেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয় আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। রাজ্যটিতে প্রায় তিন দশক পর সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পরাজিত হয়েছে।
রয়টার্সের ৪ নভেম্বরের একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোট গণনায় এগিয়ে থাকা প্রায় ২ হাজার ২০০ কাউন্টির ৯৯ শতাংশেই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় রিপাবলিকানদের ভোটের অংশ কমেছে। এসব কাউন্টিতে ট্রাম্পের ২০২৪ সালের ফলাফলের তুলনায় রিপাবলিকানদের ভোটের অংশ গড়ে ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
বিশেষ করে হিস্পানিক-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে রিপাবলিকানদের সমর্থন কমেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে ৬৪টি হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিতে দলটির ভোটের অংশ গড়ে ১৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
অথচ দু’বছর আগে নির্বাচনে ট্রাম্প হিস্পানিক ভোটারদের উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিলেন। দুই বছরের মধ্যে সেই সমর্থনের একটি অংশ ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক অর্জন
এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনাও ঘটেছে। মিশিগানে জয়ী হয়ে আবদুল এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। নির্বাচনী প্রচারে এল-সাইয়েদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্পও তাঁকে নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছিলেন।
জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হয়েছেন।
টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা প্রথম লাতিনা গভর্নর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় জেভিয়ার বেসেরা রাজ্যের প্রথম লাতিনো গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফরিসের সামনে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দলের সদস্যরা তাঁকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে পারেন। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন রিপাবলিকান মাইক জনসন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ফলাফল দলটির মধ্যে সম্ভাব্য নতুন জাতীয় নেতৃত্বের উত্থানেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন ট্রাম্প কী করবেন?
এই বিপুল পরাজয়ের ফলে ট্রাম্পের আগামী দিনগুলো যে মসৃণ হবে না তা আগাম ধারণা করা যায়। বিশেষকরে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পকে এমন একটি কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যার উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বিরোধী শিবিরের হাতে।
এতে তাঁর প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন খুব সহজেই।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ আরও কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বিভিন্ন ফেডারেল নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা সিনেটের হাতে। ফলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দিতে বা তাঁদের বিষয়ে কঠোর শুনানির আয়োজন করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগের বিষয়টি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত সিনেটের ওপর নির্ভর করবে।
তৃতীয়ত, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। প্রয়োজনে কংগ্রেসের শুনানিতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাজির হতে বাধ্য করার উদ্যোগও নিতে পারবেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসন, তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারেন। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ট্রাম্পের হাতে এখনো ভেটো দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলে তিনি ভেটো দিলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় উভয় কক্ষে পুনরায় বিলটি পাস করতে হবে।
যার অর্থ দাঁড়ায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করার মতো আসন তাঁদের নেই।
এ ছাড়া অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হলেও সিনেটে প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। বর্তমান নির্বাচনী ফলাফলে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখনও আসেনি।
ফলে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর ওয়াশিংটনে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দুই দলের মধ্যে সংঘাত এবং দর-কষাকষি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী কৌশলও কি ব্যর্থ হলো?
নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় রিডিস্ট্রিক্টিং বা জেরিম্যান্ডারিং।
এর মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে নির্ধারণ করতে পারে, যাতে নিজেদের প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ে।
রিপাবলিকানদের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রতিনিধি পরিষদে দলের আসন ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো। টেক্সাস ও ফ্লোরিডাসহ কয়েকটি রাজ্যে নতুন নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল সেই কৌশলের প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানরা নতুন সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নয়টি আসন বাড়ানোর আশা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা দলটির লক্ষ্য করা বেশ কয়েকটি আসনেও জয় পেয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের নির্বাচনী মানচিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টা তাদের প্রত্যাশিত সুবিধা এনে দিতে পারেনি।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: ফল নিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা
নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্পের বক্তব্যও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনের আগে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তাঁরা যেন তাঁকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবেই বিবেচনা করে ভোট দেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিজয়কে তিনি নিজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর তাঁর বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যায়।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নির্বাচনে ব্যালটে ছিলেন না। তিনি আরও দাবি করেছেন, নিজে নির্বাচনে থাকলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতো।
নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতিও পরাজয়ের কারণ।
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইরান যুদ্ধকে দায়ী করার বক্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব পড়তে পারে
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তাঁর দলের আসন হারানোর প্রবণতা রয়েছে।
রয়টার্সের নির্বাচনের আগের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মাত্র দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান বাড়াতে পেরেছে।
২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। ২০২৬ সালে এবার দলটি প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে।
এবারের পরাজয় রিপাবলিকান দলের ভেতরে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে জেডি ভ্যান্স, যিনি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন করে মূল্যায়নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে হাকিম জেফরিসসহ দলের বিভিন্ন নেতার রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে পারে। নির্বাচনে সফল হওয়া রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসতে পারেন।
তবে কংগ্রেসের নির্বাচনে জয় পেলেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটার অংশগ্রহণ, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনী ইস্যু ভিন্ন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং পররাষ্ট্রনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত একটি পৃথক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের বিজয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও জ্বালানির বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ট্রাম্পের শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি এবং সামরিক নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের বিরোধী নিয়ন্ত্রণ নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে পররাষ্ট্রনীতির সব সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের হাতে নয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের হাতে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে যাবে, এমনটি বলা যায় না।
বরং প্রশাসনের অর্থায়ন, নতুন আইন, সামরিক ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা বাড়বে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কংগ্রেসের নজরদারি ও রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হতে পারে।



