বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করে এখন বাদী উধাও

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

জুলাই আন্দোলনের সময় এক পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুটি থানায় দুটি হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রথম মামলাটি নিহতের মা করলেও প্রায় এক বছর পর একই ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জনকে আসামি করে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় আরেকটি মামলা করেছেন আরেক ব্যক্তি, যাকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।

পুলিশ বলছে, গাজী সেলিম নামে এক ব্যক্তির করা দ্বিতীয় দ্বিতীয় মামলার তদন্তে অভিযোগের পক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।

তদন্তে উঠে এসেছে, নিহত নাজমুল মিয়া মোহাম্মদপুরে নয়, গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ঢাকার আশুলিয়ায়। তার পরিবারের সদস্যরাও দ্বিতীয় মামলার বাদীকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জন এবং ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ১১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তিনি জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাদীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার তদন্তে এর আগেও একাধিক অসংগতি সামনে এসেছে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি, বাদীর পরিচয়, ঘটনাস্থল এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন তদন্তে ভুয়া তথ্য সামনে এসেছে।

দ্য সান টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১ নভেম্বর প্রকাশিত ‘শেখ হাসিনার দাবি কি সত্যি হচ্ছে?’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি মামলার তদন্তের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।

সেসব ঘটনায় কোথাও কথিত নিহত ব্যক্তিকে জীবিত পাওয়া গেছে, কোথাও নিহত ব্যক্তির পরিচয় ও মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে মামলার বিবরণের মিল পাওয়া যায়নি। আবার কোথাও আহত হওয়ার দাবির পক্ষে দাখিল করা চিকিৎসার কাগজপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

একটি মামলায় নূর হোসেন নামে এক ব্যক্তি জুলাই আন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লাগার দাবি করে শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদপুর থানার তদন্তে দেখা যায়, তিনি সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি এবং মামলায় দেওয়া চিকিৎসার কাগজপত্রও হাসপাতালের নয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ মিথ্যা বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

একই মৃত্যুতে পৃথক থানায় দুই মামলা

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের সময় আশুলিয়ার বগাবাড়ী বাইপাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন পোশাকশ্রমিক নাজমুল মিয়া। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট তার মৃত্যু হয়।

নাজমুল আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় মা গোলেভান বেগম আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় ৫২ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তবে সেখানে শেখ হাসিনার নাম ছিল না।

অন্যদিকে, একই মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় এক বছর পর ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন গাজী সেলিম। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড এলাকায় আন্দোলন চলাকালে নাজমুল গুলিবিদ্ধ হন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ওই দিন দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের সময় নাজমুল গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জনকে আসামি করা হয়।

তদন্তে মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ দেখতে পায়, একই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আগে থেকেই আশুলিয়া থানায় মামলা রয়েছে। দুই মামলার নিহত ব্যক্তি একই নাজমুল মিয়া। জুলাই যোদ্ধার গেজেট, জন্মনিবন্ধন এবং মেডিকেল কেস আইডি যাচাই করে বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।

বাদীকে চেনে না নিহতের পরিবার

মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, দ্বিতীয় মামলার বাদী গাজী সেলিমের সঙ্গে নিহত নাজমুলের পরিবারের কোনো পরিচয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।

তদন্ত কর্মকর্তা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তারা গাজী সেলিমকে চেনেন না। তিনি তাদের আত্মীয়ও নন। এমনকি পরিবারের কাউকে না জানিয়েই নাজমুলের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজী সেলিমকে তার সাক্ষীসহ থানায় হাজির হওয়ার জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কেউই হাজির হননি। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বাদীকে খুঁজছিল পুলিশ। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

নাজমুলের বোনের স্বামী আব্দুল মজিদ জানিয়েছেন, নাজমুল আশুলিয়ার জামগড়ার সিএম গার্মেন্টে চাকরি করতেন। তিনি কখনো মোহাম্মদপুরে থাকেননি কিংবা আন্দোলনের সময় সেখানে যাননি।

তিনি বলেন, নাজমুল আশুলিয়ায় মারা গেছেন এবং তার পরিবার আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে। অন্য কেউ একই মৃত্যু নিয়ে মামলা করে থাকলে সেটি ভুয়া হতে পারে। ওই মামলার বাদীকে তারা চেনেন না বলেও জানান তিনি।

তদন্তে যে তথ্য পেল পুলিশ

মোহাম্মদপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাজমুল মিয়ার মৃত্যুতে দুটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তারা দেখতে পান যে, একটি মামলায় ঘটনাস্থল আশুলিয়া থানার বগাবাড়ী বাইপাইল মোড়ে এবং অন্যটিতে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিহতের পরিবারের বক্তব্য, সরকারি গেজেট, জন্মনিবন্ধন ও হাসপাতালের মেডিকেল কেস আইডি যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন যে দুই মামলার নিহত ব্যক্তি একই।

তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতের পরিবারের সদস্য না হওয়া, পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকা এবং আশুলিয়া থানার মামলায় ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মোহাম্মদপুরের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ কারণে শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জন এবং মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ১১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

নাজমুলের মা গোলেভান বেগমের করা মামলায় যে ৫২ জনকে আসামি করা হয়েছিল তাদের মধ্যে শেখ হাসিনার নাম ছিল না। অথচ একই মৃত্যুর ঘটনায় পরে দায়ের করা মোহাম্মদপুরের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জনকে আসামি করা হয়।

মোহাম্মদপুরের মামলায় অব্যাহতির সুপারিশ করা অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আওয়ামী লীগ নেতা অজয় কর খোকন ও লাবনী চৌধুরী।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আগামী ১৭ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ

ads
বিজ্ঞাপন