প্রথমে তাজনূভা জাবীন, এরপর তাসনিম জারা, তাদের সঙ্গে এখন যুক্ত হলো সামান্তা শারমিনের নাম। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন এই নারীরা। তিনজনই ছেড়েছেন দল। আর এ ক্ষেত্রে মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন এনসিপির জামায়াত-সঙ্গ।
বৃহস্পতিবার সামান্তা এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, পদত্যাগপত্র তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সামান্তাসহ এই তিন নারী এনসিপি গঠনের শুরুতেই দলটিতে ছিলেন।
গত বছর কমিটি গঠনের সময় তাজনুভাকে দেওয়া হয়েছিল যুগ্ম আহ্বায়কের পদ। যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ পেয়েছিলেন জারা।
সামান্তার অবস্থান ছিল তাদের ওপরে। তাকে দেওয়া হয়েছিল জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ। অর্থাৎ দলে আহ্বায়ক নাহিদের পরের স্থানটিই ছিল তার।
তবে গত অক্টোবরের ২৩ তারিখে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠনে পদানবতি ঘটে সামান্তার। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় যুগ্ম আহ্বায়কের পদে।
তার দুই সপ্তাহের মধ্যে এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা দিলেন সামান্তা। দীর্ঘ বিবৃতিতে বেশ কয়েকটি কারণ তিনি দেখিয়েছেন, তার মধ্যে এনসিপির জামায়াত জোটে যাওয়া ছাড়াও নারী বিষয়ে দলটির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল, যাতে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের, সেই প্ল্যাটফর্মের নেতারাই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গড়ে রাজনীতির মাঠে নামেন।
এই আন্দোলনে অনেক নারীই সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, দল গঠনের পর তারা বিভিন্ন পদে আসেন। এবছর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় বেশ কয়েকজন প্রার্থীও হন।
আওয়ামী লীগবিরোধী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা সমন্বয়ক হয়েছিলেন, তাদের অনেকের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পরে বেরিয়ে আসে।
এনসিপি যখন গঠন করা হলো, তখন অনেকে একে জামায়াতে ইসলামীর ‘বি’ টিম হিসেবেই দেখছিল; যদিও এনসিপির নেতারা নিজেদের ভিন্ন হিসেবেই দেখাতে চাইছিলেন।
কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই বাম মনোভাবাপন্ন একটি অংশ এনসিপি ছাড়ে। তারা ইতোমধ্যে এনপিএ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে।
নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এনসিপির মধ্যে জামায়াত টানের প্রবণতা আরো বাড়তে দেখা যায়। প্রথমে ৩০০ আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিলেও এক পর্যায়ে দলটি জামায়াতের সঙ্গে ১১ দলীয় ঐক্যে যোগ দেয়। জোট গঠনের পর ৩০ আসনে নির্বাচন করে তারা, জয়ী হয় ছয়টি আসনে।
এনসিপির নারী নেতারা সোশাল মিডিয়ায় ‘সিস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এনসিপি নেতাদের ভারতের ‘সেভেন সিস্টার’ দখলে নেওয়ার হম্বিতম্বি দেখে কেউ কেউ ব্যাঙ্গ করেও আবার ‘সিস্টার’ বলতেন।
স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রক্রিয়ার সময়ই এনসিপির ছয় নারী নেতা তুলেছিলেন আপত্তি। তাদের মধ্যে তাজনুভা, জারা ও সামান্তা ছাড়াও ছিলেন নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন ও নাহিদা সারোয়ার নিভা।
কিন্তু দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া না পেয়ে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তাজনুভা ও জারা এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা দেন।
তখনও এনসিপির জামায়াত জোটে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তাজনুভা ও জারাকে দলের প্রার্থীও ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে তারা দুজন জামায়াত জোটের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে আগেই দল ছাড়েন।
চিকিৎসক জারা পরে ঢাকার একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন। এনসিপি ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, জনগণ যে পরিবর্তন চাইছিল, এনসিপি সেদিকে যাচ্ছিল না।
পেশায় চিকিৎসক তাজনুভা খোলাখুলিভাবেই বলেছিলেন, এনসিপি যে জামায়াতের সঙ্গে জোট করবে, তা আগেই ঠিক করা ছিল। কিন্তু দলীয় নেতারা নানা ছলে এটি আড়াল করছিলেন।
তার ভাষায়, ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে সব বিকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকে।
এনসিপি পুরো জুলাই আন্দোলনকে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে জামায়াতের হাতে তুলে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা যে কথাটি বলে আসছিলেন, তাজনুভার কথায় তারই প্রকাশ ঘটেছিল।
তার প্রায় এক বছর পর সামান্তা যে কারণগুলো দেখালেন, তার সঙ্গেও অনেকের সেই কথাটির মিল পাওয়া যায়, যারা বলে আসছিলেন, জুলাই আন্দোলন ছিল ডানপন্থিদের পরিকল্পিত একটি আন্দোলন, যা তারা নানা ছদ্মাবরণে আড়াল রাখছিল।
নতুন বন্দোবস্তের কথা বললেও ধর্ম প্রশ্নে এনসিপি নেতাদের অবস্থানের সঙ্গে ধর্মীয় দলগুলোর অবস্থানের কোনো ফারাক দেখছিলেন না অনেকেই। একই কথা খাটে নারী প্রশ্নেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী থাকার সময় যে সামান্তাকে সবাই শার্ট-প্যান্ট পরা দেখতে অভ্যস্ত ছিল, এনসিপির নেতা হিসেবে হিজাব পরা সামান্তাকে অনেকে মেলাতে পারছিলেন না।
তবে সেই সামান্তাই গত জুন মাসে ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন- এনসিপির প্রথম শ্রেণীর ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকরা অবস্থান দৃশ্যমান।

ছবিটি ছিল ১১ দলীয় ঐক্যের একটি সমাবেশের, যেখানে মঞ্চে চেয়ারে বসা ছিলেন জামায়াত, এনসিপিসহ জোটভুক্ত দলগুলোর নেতারা। আর মঞ্চের নিচের চেয়ারে বসা ছিলেন নারী নেতারা।
ছবিটি আসল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও সামান্তা বোঝাতে চাইছিলেন, নারীদের এভাবেই দেখে এনসিপি।
তবে তখনও তিনি এনসিপিতেই ছিলেন। তার দাবি, এনসিপি যে ‘ভুল’ পথে চলছে, তা গত ১১ মাস ধরে বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
নারী প্রশ্নে এনসিপির অবস্থানের বিষয়ে বিবৃতিতে সামান্তা বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধের অংশীদার ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পুরনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই প্রবণতার অনুসারী হয়েছে।’
জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন বলে সামান্তার দাবি। তিনি বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে গেছে।
সামান্তা মনে করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি করে না। বরং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নিজেদের পক্ষে ব্যবহারের প্রয়োজন থেকেই সংস্কারের কথা বলে। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন এবং প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামোও গণতান্ত্রিক নয়।
তার দৃষ্টিতে, জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এনসিপির নিজস্ব অবস্থানের পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। এ কারণে উদার গণতন্ত্রপন্থীরা এনসিপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কাউন্সিল ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনাও করেন সামান্তা, যে প্রক্রিয়ায় তার পদানবতি ঘটে।
সামান্তা বলছেন, কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
এনসিপির তিন ‘সিস্টার’ এর সঙ্গে জামায়াত নিয়ে তখন যারা আপত্তি তুলেছিলেন, তার মধ্যে মনিরা শারমিন ও নুসরাত তাবাসসুম এখনো দলটিতে রয়েছেন।
নুসরাত তাবাসসুম নারী আসনে সংসদ সদস্য হয়েছেন। প্রথমে মনিরা শারমিনকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তবে সরকারি চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। শেষে নুসরাত তাবাসসুমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
মনিরা শারমিন ও নুসরাত দুজনই এখন এনসিপিতে যুগ্ম আহ্বায়কের পদে রয়েছেন। একই পদে নারীদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদা আলম মিতু, দিলশানা পারুল, এ কে ফ্লোরা। কমিটিতে যুগ্ম সদস্য সচিবের পদে একমাত্র নারী নাহিদা সারোয়ার নিভা।
এছাড়া নারী বিষয়ক সম্পাদক পদে রয়েছেন হুমায়রা নূর, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক পদে সাগুফতা বুশরা মিশমা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক পদে মনজিলা ঝুমা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে নাবিলা তাসনিদ রয়েছেন।
অতীতে যাঁরা পদত্যাগ করেছেন
বাংলাদেশের প্রথম সারির বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর সেসময় মাত্র ১১ দিনের মধ্যে অন্তত ১৬ জন এনসিপি নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একাধিক নেতাও ছিলেন।
সেসময় পদত্যাগ করাদের তালিকায় চোখ ফেললে কার্যত দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধের চিত্রই ফুটে ওঠে। পদত্যাগকারী ১৬ কেন্দ্রীয় নেতার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো।
| নাম | এনসিপিতে দায়িত্ব |
|---|---|
| মীর আরশাদুল হক | যুগ্ম সদস্যসচিব |
| তাসনিম জারা | জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব |
| তাজনূভা জাবীন | যুগ্ম আহ্বায়ক |
| খালেদ সাইফুল্লাহ | যুগ্ম আহ্বায়ক |
| মুশফিক উস সালেহীন | যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান |
| খান মুহাম্মদ মুরসালীন | যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক |
| ফরহাদ আলম ভূঁইয়া | আইসিটি সেলের প্রধান |
| আরিফ সোহেল | যুগ্ম সদস্যসচিব |
| আজাদ খান ভাসানী | উত্তরাঞ্চলের সংগঠক |
| ওয়াহিদুজ্জামান | দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক |
| দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী | উত্তরাঞ্চলের সংগঠক |
| সৈয়দা নীলিমা দোলা | কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |
| আসিফ মোস্তফা জামাল | কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |
| মীর হাবীব আল মানজুর | কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |
| মারজুক আহমেদ | কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |
| আল আমিন আহমেদ টুটুল | কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |
এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হলো সামান্তা শারমিনের নাম, যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ হলো এনসিপিতে থাকা ‘সিস্টার’দের তালিকা।



