বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো স্যরি বলেছে, ঝড় তুলেছে, তবে জাগিয়েছে ভিন্ন প্রশ্নও

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও তার ফেসবুক পোস্ট।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও তার ফেসবুক পোস্ট।

দুই অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ ‘স্যরি’, তা সোশাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে নিয়ে এল বাংলাদেশের সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র প্রথম আলো। তা নিয়ে বিস্তর জল্পনা-কল্পনার পর এই স্যরির ব্যাখ্যাও দিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তবে তাতেও থেমে নেই আলোচনা। সম্পাদকীয় বিতর্কের পাশাপাশি ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে এটা কতটা কাজে দিল, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

ঘটনার শুরুটা ৩ নভেম্বর বিকালে। মতিউর রহমানের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে হঠাৎ একটি ফটোকার্ড শেয়ার হয়, তাতে লেখা ছিল ‘স্যরি’। এরপর প্রথম আলোর অন্য কর্মীদের ওয়ালেও তা ছড়িয়ে পড়ে।

তখনই তা নেটিজানদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, প্রথম আলো কি ভুল করেছে যে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর দেখলেন, ‘প্রথম আলো স্যরি বলেছে, কিন্তু কারণ বলে নাই।’ তাই তিনি সম্ভাব্য কিছু কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন, তা নিয়ে লিখলেনও ফেসবুকে।

আনিস আলমগীরে সম্ভাব্য হালকা কারণগুলোর মধ্যে ছিল- ভুল করে সত্য ছাপিয়ে ফেলা, গোল্লাছুট ও সুচির হিসেব মেলানো। আর গভীর কারণগুলোর মধ্যে ছিল- সরকারি চাপ, অফিস পোড়ানো এবং বিচারহীনতার প্রেক্ষাপট।

তার ভাষ্যে, পটপরিবর্তনের এই সময়ে গণমাধ্যমগুলো নানা অদৃশ্য চাপের মুখে পড়ে। প্রথম আলোর ওপর বিগত আমলেও দমনপীড়নের ইতিহাস রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ‘স্যরি’ বলা হয়তো এক ধরনের প্রতীকী আত্মসমর্পণ, প্রেশার কুকার পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ অথবা নিজেদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার মরিয়া চেষ্টা।

আপনাদের কী মনে হয়? প্রথম আলোর এই কৌশল কি টিকে থাকার কোনো চাল, নাকি চরম অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ- এমন প্রশ্ন রাখেন আনিস আলমগীর। তার মতো অনেকেই এই স্যরির বিচার-বিশ্লেষণ করতে থাকেন।

একজন আবার প্রথম আলোর ফান ম্যাগাজিন রস+আলোর তিন দিন আগের প্রচ্ছদের বিষয়টিও সামনে আনেন। ওই সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিল ‘স্যরি’।

৪ নভেম্বর রাতে প্রথম আলো সম্পাদক হাজির হয়েছিলেন চ্যানেল আইর রাতের টক শো তৃতীয় মাত্রায়। ওই অনুষ্ঠানের আলোচনার খোরাক জোগানোর কৌশলও এটা হতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছিলেন।

শেষে মতিউর রহমানের এক লেখায় এই স্যরির ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে লেখাটি প্রকাশিত হয়।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘সত্যের সঙ্গে মিথ্যার লড়াই তো হবেই। সত্যকে জয়ী হতে দেখলে মিথ্যা তো ক্ষুব্ধ হবেই।
এই হতাশ, ক্ষুব্ধ, বিরক্তদের দল কিন্তু বদলায়। যখনই আমাদের লেখা কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, সেই তখন তেড়েমেরে আসতে পারে। তাদের উদ্দেশে আমরা কী বলব?’

প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন এভাবে- ‘স্যরি, সবাইকে খুশি করতে পারিনি। (আসলে সবাইকে খুশি করতে চাই না। সেটা আমাদের কাজই নয়।)

‘স্যরি, সব বিষয়ে সহমত হতে পারিনি। (আসলে সহমত হতে চাই না। সজীব–জীবন্ত সমাজের চালিকা শক্তিই হলো ভিন্নমত।)’

‘স্যরি, অনিয়মে চুপ থাকতে পারিনি। (অনিয়মে চুপ না থাকাই সংবাদমাধ্যমের কাজ।)’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সব কর্মী। আজ বুধবার ঢাকার কেআইবি মিলনায়তনে।

‘এবং স্যরি, শত আঘাতেও থেমে থাকিনি। (কারণ, আমরা জানি, কোটি কোটি পাঠক
এবং দেশের মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। অন্ধকারের শক্তির আঘাত আমাদের থামাতে পারেনি, পারবে না।)’

এই পর্যন্ত স্যরি বলাকে ‘ব্যাজোক্তি’ হিসেবে নিজের লেখায় দেখিয়েছেন মতিউর রহমান। এ্ই শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে- ছলপূর্ণ উক্তি, কূটবাক্য বা এমন কোনো কথা যেখানে আসল মনোভাব বা উদ্দেশ্য গোপন করে ছলনা বা ব্যঙ্গ প্রকাশ করা হয়।

এর সঙ্গে ‘সিরিয়াস’ স্যরির কথাও লিখেছেন মতিউর রহমান। তার ভাষ্যে, ‘আমরা ২৮ বছরের চলার পথে কখনো ভুল করেছি, ভুলটা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেছি এবং সংশোধন করেছি। তারপরও বলব, আমাদের অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলোর জন্য আমরা আন্তরিকভাবে স্যরি।’

১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রথম আলোর কী কী ভুল তার উপলব্ধিতে ধরা পড়েছে, সে বিষয়ে কিছু লেখেননি মতিউর রহমান।

সেটা রেখেছেন উহ্য, অনেকটা তার রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়টির মতো। ‘স্যরি, সবাইকে খুশি করতে পারিনি’ শিরোনামের এই লেখায় তিনি সাপ্তাহিক একতা থেকে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর কথা বলেছেন। সবিস্তারে লিখেছেন কোন কোন সংবাদপত্রে কখন কখন ছিলেন।

কলেজ জীবনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কথাও বলেছেন। কিন্তু কোন দলে ছিলেন, তা তিনি একবারও লেখেননি; যদিও বিভিন্ন আলাপে তিনি নিজের কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত থাকার কথা গোপন রাখেন না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুখপত্র একতার সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান। মতিউর রহমানের গোটা রাজনৈতিক জীবনে এই দলটি ছিল আওয়ামী লীগের জোটে, যোগ দিয়েছিল বাকশালেও।

তবে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিক বনে যাওয়ার পর মতিউর রহমানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দা-কুমড়ো সম্পর্কই দৃশ্যমাণ ছিল। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে বের করে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন ঘটার আগে তাকে প্রথম আলো তার হাত থেকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, এমন অভিযোগও করেন তিনি।

ব্যাঙ্গ করে হলেও মতিউর রহমানের স্যরির ব্যাখ্যা অনেকে মেনে নেননি, তাদের মধ্যে সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরাও রয়েছেন। তারা বলছেন, সবাইকে খুশি রাখা তো গণমাধ্যমের কাজ নয়।

‘অপকর্মের জন্য স‍্যরি বলুন’- লিখেছেন সাংবাদিক-টিভি আলোচক আশরাফ কায়সার।

আবদুর নূর তুষার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রথম আলোর সম্পাদক বলেছেন, তারা সবাইকে খুশি করতে চান নাই। যাকে খুশি করতে চান নাই সে যদি খুশি না হয়, সেটাই তো করতে চেয়েছিলেন। তাহলে তাকে স‍্যরি বলতে হবে কেন?

‘বিষয়টা এরকম যে আপনাকে আমি অখুশি করতেই চেয়েছি, কিন্তু অখুশি করার জন‍্য স‍্যরি। কারা সেই অখুশি হবার দলে? তিনি প্রকারান্তরে বলেছেন যারা দুষ্টু লোক – দুর্নীতি করে – যারা সঠিক খবর দেখলে অখুশি হয়।

এখন তাহলে যাদের তারা স‍্যরি কার্ড পাঠাচ্ছেন তাদের তারা নিশ্চয়ই খুশি করতে চান নাই। আর তারা তো সেই দলে যাদের খুশি করার উপায় নাই কারণ তারা সেইসব দুষ্ট লোক।’

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন সেলেব্রিটিদেরও এই স্যরির ক্যাম্পেইনে সম্পৃক্ত করেছে প্রথম আলো। সেদিকটি দেখিয়ে তুষার বলেছেন, ‘সকাল থেকে দেখছি সেই সব দুষ্ট লোকরা অনেকেই আমার পরিচিত তারকা। খেলোয়াড় অভিনেতা সাংবাদিক রাজনীতিবিদ।
স‍্যরি! প্রথম আলোর এই বিষয়টা কেমন যেনো প‍্যাঁচ ঘোচ লাগিয়ে দিল।’

এই প্যাঁচে পড়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্যাঁচই বিপণনের এক কৌশল হিসেবে ভালোই কাজে লেগেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

একজন লিখেছেন, ‘প্রথম আলোর স্যরি বলার বিষয়টি কোনো বড় সংবাদগত ভুল বা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা নয়; বরং পাঠকদের চমকে দেওয়া এবং অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার একটি ব্যতিক্রমী প্রচারণা। একটি স্যরি দিয়ে পাঠকদের মনে কৌতূহল তৈরি এটিও যে দারুণ সৃজনশীল মার্কেটিং কৌশল হতে পারে, প্রথম আলো যেন সেটিই দেখাল!’

প্রথম আলো সম্পাদক ৩ নভেম্বর রাতে চ্যানেল আইর আলোচনা অনুষ্ঠানে যে তথ্য দিয়েছেন, তা এর সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ।
মতিউর রহমান বলেছেন, ‘সন্ধ্যা ৬টায় আমার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এটি পোস্ট করা হয়েছে। আমি যদি আপনাকে ৩টা সংখ্যা জানাই, এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের কাছে এটি রিচ হয়েছে বা পৌঁছেছে। ২ লাখের বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ৭ হাজারের অধিক কমেন্ট হয়েছে।’

প্রথম আলোর জীবনে এর আগে কোনো একটি বিষয় নিয়ে এত সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে তিনি ২ লাখের বেশি প্রতিক্রিয়া মধ্যে যে ‘হা-হা’ বেশি ছিল, সে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

একই পোস্ট পরে প্রথম আলোর ফেসবুক পেইজেও দেওয়া হয়। পেইজটি মনিটাইজড বলে এ থেকে প্রথম আলোর যে বড় অঙ্কের আয় হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে বাণিজ্যিক দিৃষ্টিতে তা সফল বলেও অনেকের মনে হচ্ছে।

এই পরিকল্পনায় যুক্ত একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রথম আলোর ব্র্যান্ড প্রেফারেন্স কমে আসছিল। রিডার, নন-রিডার সবার মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল বিভ্রান্তি। সময়ের পরিবর্তনে ব্র্যান্ডের মূল প্রপার্টি ‘সত্য’ও নতুন নতুন ডেফিনেশন পাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ব্র্যান্ডের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং প্রথম আলোকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল।

‘একেবারে সাদামাটা, শুধু টেক্সটনির্ভর একটি ক্যাম্পেইন। ক্যাম্পেইনটা বেশ আলোচনায় এসেছে, ভালোই ভাইরাল হয়েছে মনে হচ্ছে।’

আবার বিপরীত মত দিয়ে আরেকজন লিখেছেন, ‘প্রথম আলো কাদেরকে সরি বলল? সে প্রশ্নের উত্তরে মতিউর রহমান সাহেব সরাসরি বললেন- আমরা সরি বলছি তাদের যাদেরকে আমরা খুশি করতে পারিনি কারণ আমরা সবাইকে খুশি করতে চাই না।

‘এখন আপনি চিন্তা করেন আপনাকে সরি বলেছে, কারণ প্রথম আলো আপনাকে খুশি করতে চায় না। প্রথম আলো তার সরি ক্যাম্পেইন ন্যারেটিভ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তারা অন্যায়কে খুশি করতে চায় না, দুর্নীতিকে খুশি করতে চায় না, ফ্যাসিস্টকে খুশি করতে চায় না। আর এই একইভাবে আপনাকেও খুশি করতে চায় না কিংবা খুশি করতে পারেনি।’

‘তারমানে আপনি প্রথম আলোর কাছে আপনি এমন কিছু চেয়েছেন যেটা নৈতিকভাবে তারা দিতে পারেনি। তার জন্য প্রথম আলো স্যরি চেয়েছে আপনার কাছে। বিষয়টা তো তাই দাঁড়ালো না? সেই পোস্টার আপনি আবার পোস্ট করছেন! উত্তরে লিখছেন ‘ইটস ওকে’। বিষয়টা মজার না?’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘কয়েকটি বিষয়ে প্রথম আলোর মনে রাখা প্রয়োজন ছিল । এই সরি ক্যাম্পেইন শুরু করার আগে। মেসেজের কনসিসটেন্সি। অর্থাৎ প্রথম আলোর সকলে কি একই কথা বলছেন? অথবা এই জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হলে নানাজনের মনের মধ্যে যে নানাবিধ বিষয়ে আসবে তার সকল কিছুর উত্তর কি প্রথম আলোর সকলে জেনে শুনে বুঝে তারপরে এই ক্যাম্পেন শুরু করেছেন?

‘শুধু কি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা তোলপাড় তোলা এবং অনলাইনে হাই এনগেজমেন্ট সৃষ্টি করার জন্য এই এত বড় রিস্কি ক্যাম্পেইন প্রথম আলো করল? এর থেকে ভালো আর কোনো আইডিয়া আসলেই কি ছিল না?’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ

ads
বিজ্ঞাপন