মুশফিকের অভিজ্ঞতা, হৃদয়ের দৃঢ়তা- দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাট হাতে আলো ছড়ালেন তাওহিদ হৃদয়। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক পেয়ে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করলেন বাংলাদেশের এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান।
সিলেটের মাঠে বাংলাদেশের জন্য দিনটি ছিল পরীক্ষার। একদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বড় সংগ্রহ, অন্যদিকে প্রথম ইনিংসে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যাওয়া স্বাগতিক দল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন ছিল এমন একজনের, যিনি চাপ সামলে ইনিংসকে এগিয়ে নিতে পারবেন।
সেই দায়িত্বটাই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিলেন তাওহিদ হৃদয়।
মিরপুর টেস্টে ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সিলেটে সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ব্যাট দিয়েই। ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক শটের সমন্বয়ে খেলেছেন ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। শেষ পর্যন্ত প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান।
তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় দিন শেষে ৪০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ৮৮ রান করেছিল স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাব দিতে গিয়ে তখনও ২৬৮ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ।
ক্রিজে ছিলেন তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। দুজনের ব্যাটিংয়ে দিনের শুরুটা ভালোই হয়েছিল। আগের দিন ২৯ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয় ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস বড় করতে থাকেন। অন্য প্রান্তে অভিজ্ঞ মুশফিকও তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন।
দুজনের জুটিতে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৭৩ রান। কিন্তু ৪৮তম ওভারে সেই জুটি ভেঙে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান। তাঁর অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট কভারে ব্র্যান্ডন কিংয়ের হাতে ক্যাচ তুলে দেন মুশফিক। ৭৪ বলে ৩৪ রান করে ফেরেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান।
মুশফিকের বিদায়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১২৪ রানে ৪ উইকেট। ব্যক্তিগত ৪৬ রানে অপরাজিত ছিলেন হৃদয়।
এরপর নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকের দেখা পান হৃদয়। জশুয়া বিশপকে চার মেরে ১০৯ বলে পঞ্চাশ পূর্ণ করেন তিনি। মিরপুরে আগের টেস্টে করা নিজের সর্বোচ্চ ৪২ রানও ছাড়িয়ে যান এই ইনিংসে।
যদিও হৃদয়ের ব্যক্তিগত সাফল্যের মাঝেও বাংলাদেশের বিপদ বাড়তে থাকে।
মুশফিকের মতোই জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ দেন লিটন দাস। মাত্র ৭ বলে ৮ রান করে ফেরেন তিনি। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ১৬ রান করে বিদায় নেন। তাঁর সঙ্গে হৃদয়ের ৪১ রানের জুটি ভাঙেন রস্টন চেইসের বলে জাস্টিন গ্রিভসের নেওয়া দুর্দান্ত ক্যাচ।
একপর্যায়ে ১৭৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
এমন পরিস্থিতিতে হৃদয়ের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছিল স্বাগতিকদের। শেষ পর্যন্ত হাসান মাহমুদও ১ রান করে ওয়ারিক্যানের শিকার হন। ৬৪ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ১৮৪ রানে ৭ উইকেট।
তবে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পথে এগিয়ে চলছিলেন হৃদয়। তাঁর ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ ইনিংসকে আরও বড় করার চেষ্টা করে।
প্রথম ইনিংসে হাসানের ছয় উইকেট
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আলোচনায় হৃদয় থাকলেও ম্যাচের আগের দিনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি ছিল হাসান মাহমুদের বোলিং।
প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যান আমির জাঙ্গো দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে দলকে বড় সংগ্রহের পথে নিয়ে যান। তাঁর ১৩৩ রানের ইনিংসের পাশাপাশি জাস্টিন গ্রিভস করেন ৫১ রান। একপর্যায়ে সফরকারীদের সংগ্রহ ছিল ২৩৫ রানে ৪ উইকেট।
সেখান থেকে দ্বিতীয় নতুন বলে দুর্দান্ত বোলিং করেন হাসান। জাঙ্গোর রক্ষণ ভেঙে তাঁকে ফেরানোর পর পরের বলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রস্টন চেইসকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দেন তিনি। হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
হাসান শেষ পর্যন্ত ৯০ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন। টেস্ট ইনিংসে একাধিকবার ছয় উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি পেসার হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন তিনি।
তবে হাসানের অসাধারণ বোলিংয়ের পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস থামে ৩৫৬ রানে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে তাই শুরু থেকেই ছিল বড় লক্ষ্য।
হৃদয়ের শতকে নতুন অধ্যায়
হৃদয়ের এই ইনিংসের গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলকে সীমাবদ্ধ নয়। মিরপুরে সমালোচনার মুখে পড়ার পর সিলেটে তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ভিন্ন মানসিকতার ছাপ। শুরুতে সতর্ক থেকে উইকেটে থিতু হয়েছেন, পরে সুযোগ বুঝে রান তুলেছেন।
মুশফিকের সঙ্গে তাঁর ৭৩ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিয়েছিল। মুশফিক বিদায়ের পরও তিনি হাল ছাড়েননি। একের পর এক সতীর্থের বিদায়ের মধ্যেও নিজের ব্যাটিংয়ে মনোযোগ ধরে রেখেছেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে শুরু থেকেই ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গেছে। ইনজুরির কারণে শাদমান ইসলাম প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে পারেননি। অন্যদিকে নাঈম হাসান, তানজিদ হাসান ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুত ফিরে যাওয়ায় চাপে পড়ে দল।
এরপর মুশফিক ও হৃদয় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুশফিক, লিটন ও মিরাজের বিদায়ের পর বাংলাদেশের লড়াই অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে হৃদয়ের ওপর।
সর্বশেষ প্রকাশিত স্কোরের সারাংশে বাংলাদেশকে ৬৮.১ ওভারে ২০৫ রানে ৭ উইকেট হারানো অবস্থায় দেখা যায়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে বাংলাদেশের সামনে এখনও কঠিন সমীকরণ। প্রথম ইনিংসের ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচে ফেরার পাশাপাশি পরবর্তী ইনিংসেও ভালো করার বিকল্প নেই স্বাগতিকদের।



