দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েও আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন।
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা ব্যক্ত করলেও ঠিক কবে ও কোন প্রক্রিয়ায় তিনি দেশে ফিরবেন সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি ওই সাক্ষাৎকারে।
শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর অভিযোগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই অভিযানে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এপি।
বার্তা সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি জুলহাস আলম শেখ হাসিনার ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এদিকে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভারত তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি।
আগস্ট মাসেই শেখ হাসিনা প্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ডিসেম্বর মাসে তিনি দেশে ফিরবেন।
এপিকে ই-মেইলে পাঠানো উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মৃত্যুই যদি আমার ভাগ্যে লেখা থাকে, তাহলে আমি নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে চাই। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরব। এই সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
গত সপ্তাহে তাঁর কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল এপি। বুধবার সেসব প্রশ্নের লিখিত উত্তর দেন তিনি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা শেখ হাসিনা কীভাবে ভারত থেকে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে দেশে পৌঁছানোর পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জানি, দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কারাগারে পাঠানো হতে পারে, নির্যাতন করা হতে পারে, এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। কিন্তু দূর থেকে আমার মানুষকে কষ্ট পেতে দেখে বাকি জীবন কাটাতে পারব না।’
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। পরবর্তী ১৮ মাস তিনি দেশ পরিচালনা করেন।
এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়ে ক্ষমতায় আসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তারেক রহমান। ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার অনেকে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
শেখ হাসিনার অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ হাজার নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার ওপরও আঘাত এসেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে এখন কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই।’ কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে দমনের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারেক রহমানের সরকারের সমালোচনা করেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
দেশে নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি কোনো বিদেশি শক্তির সুরক্ষা চান না।
তিনি বলেন, ‘আমি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সব সময় এমন ছিল। কিন্তু নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ আমার প্রয়োজন নেই।’
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এসব গোষ্ঠী উদারপন্থী শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ড দমনের চেষ্টা করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরাও বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
তবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। বর্তমান সরকারও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সমালোচনার মুখে রয়েছে।
শেখ হাসিনা তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে কট্টরপন্থীদের প্রভাব বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এপি। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনা এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক সুলতানা রহমানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে নিজের নিরাপত্তা, মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা এবং দেশে ফিরে থাকার মতো বাড়ি না থাকার বিষয়েও কথা বলেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আকাশ হবে তাঁর ছাদ, আর মাটি হবে তাঁর ঘর। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও দোয়াকেই তিনি নিজের সম্বল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।



