এক যুগের অভিনয় জীবনে সিনেমা দুই ডজনও নয়, তার মধ্যে খুব যে আলোচিত সিনেমা আছে, এমনটাও নয়। তবুও পরীমনি আলোচনায়, বরাবরই। সেই সিনেমায় নামার সময় থেকেই। এই আলোচনায় সমালোচনা আছে, বিতর্ক আছে, প্রশংসাও আছে। তবে সব কিছুর পর আছে সন্দেহ। কিছু আড়াল করতে কি পরীমনিকাণ্ড?
সেই ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলার পর মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলের ভাত খেয়ে আসা থেকে শুরু করে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়ে গালাগালি করা, পরীমনির সব্ কিছুতেই ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত পান অনেকেই।
এ যেন পরীমনির সেই সব সিনেমার মতো, যেগুলোর নাম ঘোষণা হলেও দেখেনি আলোর মুখ, আবার শুটিং শেষ হলেও আসেনি রুপালি পর্দায়। ২০১৫ সালে পরীমনি ঢালিউডে নেমেই ফেলেছিলেন শোরগোল। কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি, অথচ দুই ডজনের মতো সিনেমায় অভিনয় করতে চুক্তি! এমনটা বাংলাদেশে আর কোনো অভিনয়শিল্পীর বেলায় ঘটেনি। কিন্তু পরীমনির সেই সিনেমাগুলোর অধিকাংশই আর শেষ হয়নি।
সিনেমার নায়িকা পরীমনির জীবনটাও সিনেমার মতোই। মাকে হারান ছেলেবেলায়, পরীমনির বয়স তখন বছর তিনেক। আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন তার মা সালমা সুলতানা।
এরপর তার পুলিশ কনস্টেবল বাবার মৃত্যুও হয় অপঘাতে। শোনা যায়, অকালে পুলিশের চাকরি হারানোর পর ২০১২ সালে নিজের জেলা নড়াইলে ব্যবসায় নেমেছিলেন তার বাবা মনিরুল ইসলাম। ব্যবসায়িক বিরোধে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ।
তখন পরীমনির বয়স ২০ বছর। তার জন্ম ১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় নানার বাড়িতে। তার নাম রাখা হয়েছিল শামসুন্নাহার স্মৃতি। পরীমনি বলেন, তার নানী তাকে পরী বলে ডাকতেন। পরে তা তার নামের সঙ্গে জুড়ে যায়। সিনেমায় নামার পর তার সঙ্গেই যুক্ত হয় মনি।
মাকে হারানোর পর নানা বাড়িতেই তার বেড়ে ওঠা। স্কুল পাস দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন পিরোজপুর বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজে, কিন্তু পড়াশোনা শেষ করেননি। কারণ তার আগেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন, নাচ শিখতে ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে, যুক্ত হয়ে যান মডেলিংয়ে।
এরমাঝে টুকটাক টিভি নাটকে অভিনয় করলেও ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া শাহ আলম মন্ডল পরিচালিত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে পরীমনির। তবে তার আগেই ২৩টির মতো সিনেমায় অভিনয় করতে চুক্তিবদ্ধ হলে তাকে ঘিরে শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

এর মধ্যে রানা প্লাজা নামে একটি সিনেমাও ছিল, যেখানে পরীমনি অভিনয় করেছিলেন রেশমা চরিত্রে। ২০১৩ সালে ঢাকার সাভারের বহুতলা ভবন রানা প্লাজা ধসের ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার পোশাক শ্রমিক রেশমা বেগমকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরীমনি। তবে সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র না পাওয়ায় রেশমা রূপে পরীমনিকে দর্শকরা কেউ দেখেনি।
এরপর পরীমনি রক্ত, স্বপ্নজাল, বিশ্বসুন্দরী, গুণিন, মা, অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবনসহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। মেরিল-প্রথম আলো তারকা পুরস্কারসহ কয়েকটি পুরস্কারও পান। তবে তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডই তাকে আলোচনায় ধরে রাখে।
সিনেমায় নামার আগেই তার দুটি বিয়ে ও বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ পায়, তা নিয়ে আলোচনাও হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে এই চিত্রতারকা কখনো মুখ খোলেননি। আরেক অভিনেতা শরীফুল রাজকে বিয়ে করে মা হলেও পরীমনির এই বিয়েও স্থায়ী ছিল দুই বছর মাত্র।
রাজকে বিয়ের কথাও পরীমনি প্রকাশ করেছিলেন কয়েক মাস পরে। ২০২১ সালের অক্টোবরে, তার দুই মাস আগে তিনি যখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন, তখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে পরে প্রকাশ পেয়েছিল।
মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার দুই মাস আগে ২০২১ সালের জুন মাসে পরীমনি একটি অভিযোগ তুলে আলোড়ন তোলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে মা সম্বোধন করে তার উদ্দেশে লেখা এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে রেপ এবং হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’
কোথায়, কবে এই ঘটনা ঘটেছে, তার কিছুই তখন জানাননি তিনি। তবে ঢালিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিত্রনায়িকার এমন অভিযোগে সরকারসহ সব মহলে তোলপাড় শুরু হয়।
এরপর পরীমনি সংবাদ সম্মেলনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তার চার দিন আগে রাজধানীর উত্তরার ঢাকা বোট ক্লাবে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছিল, তাতে বাধ দিলে তাকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়।
পরীমনি মামলা করেন বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (বিনোদন ও সংস্কৃতি), আবাসন ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদের বিরুদ্ধে। নাসিরকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ।
এই ঘটনায় যখন পরীমনির প্রতি সবার সহানুভূতি, তখন ৪ আগস্ট রাতে পরীমনির বাসায় আকস্মিক অভিযান চালিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যায় র্যাব। পরে জানানো হয়, এই চিত্রনায়িকার বাসায় বিদেশি মদ ও মাদক পাওয়া গেছে।
মামলা হয় পরীমনির বিরুদ্ধে। সেই মামলায় তাকে যেতে হয় কারাগারে। ২৭ দিন পর জামিনে মুক্তি পেয়ে হুড খোলা গাড়িতে চড়ে ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে ঢাকায় ফেরেন পরীমনি।
তবে তখন তার হাতে লেখা এক বার্তা বেশ আলোচনা তৈরি করেছিল। ভক্তদের উদ্দেশে হাত নাড়ার সময় দেখা যাচ্ছিল, তার তালুতে মেহেদীর রঙে ইংরেজিতে লেখা ‘ডোন্ট’, তারপর তিনটি হৃৎপিণ্ডের চিহ্ন, তারপর লেখা ‘লাভ মি বিচ’, এরপর একটি উত্থিত মধ্যমা। কার উদ্দেশে পরীমনির ওই বার্তা? তার উত্তর মেলেনি। পরীমনিকে গ্রেপ্তারের সেই অভিযানের পেছনে অন্য কোনো কাহিনী রয়েছে কি না, তখন তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল।
কারণ তার ঠিক তিন দিন আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল দুই মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌকে। এর মধ্যে পরীমনিকে গ্রেপ্তারের অভিযান চালায় র্যাব।

পরীমনি দাবি করেছিলেন, তিনি বোট ক্লাবে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
বেনজীর র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনের পর তখন আইজিপির দায়িত্বে ছিলেন। তবে র্যাবের ওপর তার প্রভাব তখনও ছিল বলে মনে করা হয়।
আবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার হারুন-অর-রশীদ তখন বলেছিলেন, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নেতারাই পরীমনিকে পুলিশপ্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দিয়েছিলেন।
পরীমনিকে গ্রেপ্তারের মতো আলোচিত ঘটনার জন্ম দেওয়া অন্য কোনো ঘটনাকে আড়ালের চেষ্টা কি না, সেই আলোচনাও উঠেছিল তখন ।
এরমধ্যে পরীমনি যে মামলা নাসিরের বিরুদ্ধে করেছিলেন, তার তদন্ত দেখভালের দায়িত্ব পালন করছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপ কমিশনার গোলাম সাকলায়েন। সেই সূত্রে পরীমনির বাসায় তার যাতায়াতের খবরও প্রকাশ হয়ে পড়ে। ফাঁস হওয়া একটি ভিডিওতে তাদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যাওয়ার তা নিয়ে পুলিশ পড়ে চাপে।
তদন্তে দেখা যায়, র্যাবের অভিযানের তিন দিন আগে পরীমনির বাসায় ১৮ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন সাকলায়েন। এরপর তাকে প্রথমে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের চাকরিই হারান তিনি।
এদিকে ব্যবসায়ী নাসির জামিনে মুক্তির পেয়ে পরীমনির বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। তাতে তিনি বোট ক্লাবে ভাংচুর চালানো এবং তার ওপর হামলার অভিযোগ তোলেন। পুলিশ সেই মামলার তদন্ত করে পরীমনিকে আসামি করে অভিযোগপত্রও দেয়।
মামলাটির ঘানি এখনো টানতে হচ্ছে পরীমনিকে। তবে এর মধ্যেই শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে একবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আদালত। তখন তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন।
কিন্তু গত বুধবার আবার একই কাজ করেন তিনি। আদালতে গড় হাজির হওয়ায় আবার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
আগের মতোই পরদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন এই চিত্রনায়িকা। ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে এজলাস থেকে বেরিয়ে আসার কালে এক সাংবাদিকের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান তিনি।
অযাচিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে সমকালের ওই সাংবাদিকের দিতে তেড়ে যান পরীমনি; অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করেন।
পরীমনির এই আচরণের সমালোচনা যেমন হচ্ছে, তাকে সোশাল মিডিয়ায় হেনস্তা যেমন করা হচ্ছে; তেমনি ‘ব্যাড টাচ’ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোয় তার প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষও কম নেই।
পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি চললেও বিষয়টি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে রূপ নিয়েছে। আর তা জাতীয় জীবনের অনেক কিছুই ঢেকে দিচ্ছে।
আর সেটাই সন্দেহজনক বলে মনে করছেন কেউ কেউ; যারা বলছেন, পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত কি না, তা মনে করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
যেমন কবি-সাংবাদিক ব্রাত্য রাইসু তার পুরনো একটি পোস্ট নতুন করে সামনে এনে এমন ইঙ্গিতই করেছেন।
২০২১ সালে পরীমনি মুক্তি পাওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, “পুরো ঘটনাটাই শো-অফ। এই শো-অফে পরীমনি-সরকার এক পক্ষে ছিল।
“পাবলিকরে বোকা বানানোর জন্য উনাকে ব্যবহার করা হইছে। ভবিষ্যতেও হবে। যখনই ভারী ইস্যু সামনে আইসা দাঁড়াবে, তখনই তিনি আবার গ্রেপ্তার হবেন।”
গত ৫ নভেম্বর রাইসু পুরনো লেখাটি রি পোস্ট করার পর এজন মন্তব্য করেছেন, ‘একদম ই এগ্রিড। শ্রমিক আন্দোলন, গ্যাসের মুল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি ইস্যু ঘোরানোর জন্য এখন আবারো এই কাহিনিকে সামনে আনা হলো।’
তাহলে পরীমনি হচ্ছেন ক্ষমতাসীনদের খেলার হাতিয়ার? এমন কথাই কি দাঁড়াচ্ছে?
পরীমনির জীবনটাই সিনেমার মতো। শৈশব থেকেই তাই। সিনেমার মতোই তার জীবনে ক্লাইমেক্স আসছে, একের পর এক। এখন চূড়ান্ত পরিণতি কী? এই চিত্রনায়িকার জীবনের গল্পটি শেষ অধ্যায়ে গিয়ে ট্রাজেডি না কমেডি হয়ে দাঁড়াবে, তাই এখন দেখার বিষয়।


