২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশ ছাড়েন, তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরটি তার মুখ থেকেই শোনা গিয়েছিল প্রথম। সেদিন বিকালে সাংবাদিকদের সেনানিবাসে ডেকে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে কাজ পরিচালনা করব।’ তার ওই কথা বলার আগ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিল না শেখ হাসিনা কোথায় আছেন। শেখ হাসিনার সরকারই তাকে সেনাবাহিনীর প্রধানের পদে নিয়োগ দিয়েছিল তার ঠিক দেড় মাস আগে।
তখনকার ওয়াকার আর বর্তমান ওয়াকারের সঙ্গে যদি কেউ মেলান, কিছু পরিবর্তন খুঁজে পাবেন। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো, নিজের নামটিই বদলে ফেলেছেন ওয়াকার। এই বদলে অবশ্য নাম পুরোপুরি বদলায়নি, পরিবর্তন হয়েছে ইংরেজি বানানে।
ওয়াকার তার নামটি ইংরেজিতে আগে লিখতেন- waker। ২০২৪ সালের ১১ জুন যখন জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের উত্তরসূরি হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন নামটি waker বলেই জানানো হয়েছিল।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) ওয়েবসাইটে এখন ১১ জুন, ২০২৪ তারিখের সংবাদটি পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল- ‘Lieutenant General Waker-Uz-Zaman, OSP, SGP, psc, has been appointed as the Chief of Army Staff (CAS) of Bangladesh Army for three years. His appointment will be effective from June 23 (afternoon), 2024’
দুই বছর পর পেরিয়ে এখন আইএসপিআর থেকে জেনারেল ওয়াকারের যে ছবি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে তার উর্দিতে যুক্ত নামফলকে নামের বানানটি দেখা যাচ্ছে- waqar।
কেন হঠাৎ এই পরিবর্তন, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তার এই নামের বানান পরিবর্তনের সঙ্গে আরেকটি পরিবর্তনের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছেন অনেকে।
ওয়াকার যখন সেনাপ্রধান হন, তখন তার মুখমণ্ডল ছিল ক্লিন শেভড অর্থাৎ শ্মশ্রুমুণ্ডিত। অভ্যুত্থানের সময় থেকে তাকে সেই মুখাবয়বেই দেখা গেছে। কিন্তু এখন তার মুখমণ্ডল শ্মশ্রুমণ্ডিত, অর্থাৎ দাড়ি আছে তার, গোঁফও আছে।

সেনানিবাসে বিভিন্ন সময়ে নামাজে ইমামতি করছেন জেনারেল ওয়াকার, এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
এই দেখে কেউ কেউ ধারণা করছেন, ধর্মের পথে ঝুঁকে পড়ার পর ওয়াকার আরবি হরফের সঙ্গে মিল রাখার জন্যই ইংরেজি নামের বানানটি পরিবর্তন করেছেন।
ওয়াকারের সেনাপ্রধান হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক। বিয়ের সূত্রে শেখ হাসিনার আত্মীয় তিনি।
ওয়াকারের স্ত্রী ফারাহনাজ কমলিকার বাবা ছিলেন জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর চাচাত বোনের স্বামী। সেই সূত্রে শেখ হাসিনার ফুপা।
শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর মুস্তাফিজুর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে জেনারেল করে তাকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে জেনারেল পদবি দেওয়ায় তা বাতিল করে দেয়।
ওয়াকারের বাড়ি শেরপুরে। তার পরিবারের ইসলামী রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠতার কথাও শোনা যায়। তারপরও মুস্তাফিজের জামাতা হিসেবে সেনাবাহিনীতে একের পর এক বড় পদ পেরিয়ে সর্বোচ্চ পদে আসীন হন তিনি।
ওয়াকার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৮৫ সালে। একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, একটি পদাতিক ব্রিগেড এবং পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন তিনি। স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস এবং সেনা সদর দপ্তরে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পান তিনি।
ওয়াকার সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিবের দায়িত্ব পান ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তার আগে তিনি নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক ছিলেন।
২০২০ সালের নভেম্বরে মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন ওয়াকার। এরপর শেখ হাসিনা তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) করেন।
পরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের (পিএসও) দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াকারকে। ২০২৪ সালের শুরুতে সেনাবাহিনীর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) করা হয় তাকে। এর কয়েক মাসের মধ্যে চিফ অব আর্মি স্টাফ হন তিনি।
ওয়াকার ২০২৪ সালের ২৩ জুন থেকে তিন বছরের জন্য সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। ফলে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের ২২ জুন পর্যন্ত তার মেয়াদ রয়েছে।
ওয়াকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়িয়ে এখন বিএনপি রয়েছে সরকারে। এরমধ্যে বিভিন্ন সময় নানা গুঞ্জন উঠলেও তিনি টিকে আছেন তিনটি সরকারের সাক্ষী হওয়া দেশের একমাত্র সেনাপ্রধান হিসেবে।


